মোট পৃষ্ঠাদর্শন

মঙ্গলবার, ৫ জুন, ২০১৮

আমরা জুড়ে যেতে পারি না?



লাইনটা সাপের মতো এঁকে বেঁকে গোর্কি সদনকে ঘিরে ধরেছে। লাইনের একদম শেষের দিকে আছি আমি। টেনশান আছে মনে। ঠিক ভাবে ঢুকতে পারবো তো হলে? অফিস থেকে আর একটু আগে ছুটি পেলে ভালো হতো। সময়টা এই শতকের গোড়ার দিকের। আমরা প্রচন্ড আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি পরিচালকের প্রথম কাহিনীচিত্র দেখবো। এই ছবি নিয়ে টুকরো টুকরো খবর ঘুরে বেড়িয়েছে ফিল্ম ক্লাব গুলোতে। ছবি ভালোবাসা মানুষগুলোর ব্যাগে, কথায়, লেখনীতে। তখনও ছবিটা সেইভাবে দেখানো হয়নি নানা জায়গায়। যতদূর মনে পড়ছে আইজেনস্টাইন সিনে ক্লাব আর গোর্কিসদনের ব্যবস্থাপনায় আমরা দেখতে চলেছি তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’। বাংলাদেশের মাঠ ঘাট, নদী, পালা পার্বণ যখন আছড়ে পড়ছিল সাদা পর্দার গায়ে। মগ্ন হয়ে গিয়েছিল দর্শকেরা। মনে তখন প্রশ্ন জাগতো এই ছবি এই বাংলার হল গুলোতে কেন চলবে না? কেন সবাই দেখার সুযোগ পাবে না? তারও অনেক পরে পরিচয় হয়েছিল তারেক ভাইয়ের সাথে। ছবি দেখার সূত্র ধরেই। তিনি সেবার দেখাতে ঝুলি ভর্তি করে নিয়ে এসেছিলেন ছবি। ‘মুক্তির গান’ দেখে নন্দন থেকে যখন বেরোচ্ছি কথা বলার ভাষা ছিল না আমাদের কারও। ‘অন্তরযাত্রা’ এতো শুধু মা আর ছেলের গল্প নয় দেশের কাছে ফিরে আসার এক অন্তরমুখী চেতনার টান। নন্দন চত্ত্বরে আরও বন্ধুদের সাথে ঘুরতে ঘুরতে কথায় আড্ডায় জানতে চেয়েছিলাম তারেক ভাইয়ের কাছে আমরা জুড়ে যেতে পারি না আবার ছবি দিয়ে? খুব সুন্দর কথা বলেছিলেন তারেক ভাই। জুড়েই তো আছি কল্লোল। না হলে ‘মুক্তির গান’ দেখাই কী করে? আমার ‘অন্তরযাত্রা’? সত্যি হয়তো তাই। কিন্তু সেতো মুষ্টিমেয় মানুষের কাছে। আর সমগ্রের স্বার্থে যদি ভাবা যায়। এক ভাষার স্বার্থে যদি ভাবা যায়। বাণিজ্যের আদান প্রদানের জন্য যদি ভাবা যায়? সেদিন বেশীক্ষণ কথা এগোয়নি। সম্ভব ছিল না। তারপর আর দেখা হয়নি তারেক ভাইয়ের সাথে। এরও অনেকদিন পরে ইউ ল্যাবের এ্যানিমেশান বিভাগের অধ্যাপক শিপু ভাইয়ের সাথে গিয়ে দেখা করেছিলাম ক্যাথরিন মাসুদের সাথে। নিয়ে এসেছিলাম তাঁর শেষ ছবি রানওয়ে। যে বিপন্নতা মানুষের আড়ালে আবডালে মাথা উচিয়ে বড় হচ্ছে সেই বিপন্নতার অংশীদার তো আমরা সবাই। কাজেই ওই...আবার জুড়ে যাবার প্রশ্ন। অনেক বড় দর্শকের চাহিদা...। অনেকের কাছে পৌঁছোনোর আবেদন। ‘চলচ্চিত্র যাত্রা’ বইটি পড়েও বেশ বোঝা যায় তারেক মাসুদও চেয়েছিলেন সেই দর্শকদের পেতে। সেই হল গুলোতে ঢু মারতে যারা কোনদিন তথাকথিত পরীক্ষা নিরীক্ষা মূলক ছবি দেখেননি বা প্রদর্শন করেননি। মুক্তির গান নিয়ে তার বিভিন্ন জায়গায় ছুটে যাওয়া বা রানওয়ে দেখানোর জন্য মরিয়া প্রচেষ্টা সেই সব কথারই সূত্র বহন করে। 

বেশ কয়েকবার ঢাকাতে যেতে হয়েছিল কার্যসূত্রে। কাজের অবসরে কয়েকবার যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল মাল্টিপ্লেক্সগুলোতে। নজরে পড়ছিল অধিকাংশ ইংরাজী ছবির আধিপত্য। অবাক হয়েছিলাম যখন বসুন্ধারায় পোষ্টার দেখতে পেলাম একটি তথ্যচিত্রের। ‘শুনতে কি পাও’? মনে হয় সেই বছরেই পুরষ্কার পেয়েছিল ছবিটি মুম্বাই ইন্টারন্যাশানাল ফিল্ম ফেস্টিভালে। ঢাকার বন্ধুদের সাথে দেখতে গেলাম। আর কি আশ্চর্যের সাথে আবিষ্কার করলাম ছবিটাতে সম্পাদনার কাজ করেছেন আমার কলকাতার বন্ধু। ছবি দেখে বেরিয়েই তাকে পাঠালাম বসুন্ধরার ছবি। বিশাল পোষ্টার। ছবি দেখতে আসা মানুষের ভিড়। কলকাতায় বসে তখন উত্তেজিত সে। কিন্তু এমনটাই তো হওয়ার কথা ছিল। না হলে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ কী করে হতো? ‘পালঙ্ক’? ‘পদ্মা নদীর মাঝি’? ‘মনের মানুষ’? ‘শঙ্খচিল’? ‘ডুব’? আরও এমন কত কত? এই ধরনের আদান প্রদানগুলো যত বাড়বে তত মনের জানলা গুলো খুলে যাবে নানা দিকে। বাণিজ্যের তরী গুলো ছুটবে সাঁই সাঁই করে। একই সাথে বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গে যদি বাংলা ছবি মুক্তি পায় তাহলে দুই দেশের চলচ্চিত্র শিল্পে জোয়ার আসতে বাধ্য। সরকারী ফাইলে। নীতিমালায় কি আছে আমি জানি না। বাণিজ্যের সেই পাওয়া না পাওয়ার জটিল সমীকরণেও যেতে মন চায় না। আপাত দেখায় যেটুকু ধরা পড়ে, মনে হয়... সেটা বলতে চাই। 

বাংলাদেশে কোন এক তরুণ পরিচালকের ছবি নিয়ে যখন হইচই হয়। মনে হয় এটা কেন আমি এখানে বসে এক্ষুনি আমার হলে দেখতে পাবো না? বা যখন বাংলাদেশের বন্ধুরা বলেন আপনাদের ওই ছবি দেখতে এখনও এক মাস বসে থাকতে হবে তখন মন খারাপ হয়। আজিজ মার্কেটে বই ঘাটতে ঘাটতে মনে হতো যদি পাঠক সমাবেশ কলেজস্ট্রিটে, গড়িয়াহাটে, যাদবপুরে স্টল দিতো। যদি রঙ এর একটা বড় শো রুম থাকতো কলকাতায়। যদি চন্দননগরের জলভরা সন্দেশ ফাহমিদ ঢাকায় বসে খেতে পারতো। কিম্বা আমি ময়মনসিংহের মন্ডা উত্তরপাড়ায়। কী এমন ক্ষতি হতো? যদি এমনটা হতো বন্ধুরা কবে নিয়ে আসবে তার প্রতীক্ষা না করেই আমি শাহবাগের নানা রকমের ডিজাইনের গেঞ্জি কিনতে পারতাম এখানে বসেই তাহলে কি মজাটাই না হতো? 

তবে এর কিছু কিছু কলকাতা শহরে শুরু হয়েছে সবেমাত্র। পাঠক সমাবেশ তাদের একটা স্টল করেছেন কলেজস্ট্রিটে। ধ্যানবিন্দু রাখছেন বাংলাদেশের অনেক লিটল ম্যাগাজিন। লিখে দিলে মাস দুয়েকের মধ্যে এনে দেবেন বলছেন। আজিজ মার্কেটের বিদিত রাখছেন এদিককার অনেক তরুণ লেখকের বই। আজ থেকে দু বছর আগে বাংলাদেশের বই পেতে হলে হাতে গোনা কয়েকজন ছিলেন তারাই এনে দিতে পারতেন। তাও সময় লাগতো অনেক। কিন্তু চিত্রটা পাল্টাতে শুরু করেছে। আমার আশা ছবির মানচিত্রও পালটাবে। একই সাথে আমরা দুই বাংলার মানুষজন ছবির প্রথম দিনের প্রথম শোয়ের দুর্লভ মুহূর্ত শেয়ার করবো নিশ্চই একদিন। 
ছবি আমাদের জুড়ে দেবে দুই দেশকে...মানুষকে...সংস্কৃতিকে...ভাষাকে... নিশ্চিত। 
 লেখাটি 'বাংলাদেশের খবর'-এ প্রকাশিত। ২১ এপ্রিল,২০১৮।

বুধবার, ৭ মার্চ, ২০১৮

তিনি আমাদের মেঘে ঢাকা তারা



সারা দিনের কর্মক্লান্ত কলকাতা শহরের রাস্তায় একটি মেয়েকে হাতে গুচ্ছের কাগজপত্র আর একটা কালো ছাতা নিয়ে হাঁটতে দেখতেন পরিচালক ঋত্ত্বিক। মেয়েটি এই শহরের খুব বেশী দিনের বাসিন্দা নয়। মেয়েটি এসেছে তার জন্মভূমি থেকে উৎপাটিত হয়ে এক নতুন শহরে। এসেছে বাবা, মা, দাদা, ভাই বোনদের সাথে। রয়েছে কলোনী এলাকায়। যেখানে মানুষদের মনে দানা বেঁধে আছে স্বাধীনতা মানে দেশভাগ। মনের মধ্যে সেঁধিয়ে আছে নিজের দেশে পর হয়ে যাওয়ার অপমান। সংসারের গায়ে মাটির প্রলেপের মতো হাহাকার করছে উদ্বাস্তু পরিবারের দারিদ্র্য। মেয়েটিকে সারাদিন খাটতে হয়। চটি ফটাস ফটাস করে টিউশানি থেকে শুরু করে অফিস, সংসারের দেখভাল সবই করতে হয় তাকে। এতোসব কিছুর মধ্যে মেয়েটি প্রেম করে। একটা মিষ্টি প্রেম। যে ছেলেটাকে সে ভালোবাসে সে আবার তাকে রোজ চিঠি দেয়। এতো পরিশ্রম যে মেয়েটির পক্ষে একদম ভালো নয় সেটা সে বারবার বলে। কিন্তু একদিন সে নিজেও চলে যায়। প্রতীক্ষা কেন করবে সে? সেতো আর মেয়েটির মতো সবার জন্য বাঁচছে না। এতো উদার সবাই হতে পারে না। এতো বোকাও। কাজেই মেয়েটির বোনের সাথে ছেলেটির বিয়ে হয়ে যায়। একই ছাদের তলায় প্রেমিক আর নিজের মুখের ভাত তুলে দেওয়া বোনকে মেয়েটি যেন চিনতে পারে না আর। যাদের সে রক্ত মাংসের খাটনি দিয়ে আগলে রেখেছিল। নিজের সব সুখ আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে তাদের বড় হবার সাধ পূরণ করছিল। তাকে সবাই আস্তে আস্তে ছেড়ে চলে যায়। এক বুক ভরা বেদনার রক্ত নিয়ে মেয়েটা বাঁচে। সেই রক্ত কখনও কখনও বেরিয়ে আসে তার মুখ দিয়ে। এক মারণ রোগ বাসা বাঁধে জগদ্ধাত্রী পুজোর দিন জন্ম নেওয়া মেয়েটির শরীরে। তারপর একদিন তাকে হারিয়ে আসতে হয় পাহাড়ে ঘেরা টিবি হাসপাতালে। মারা যাবার আগের মুহূর্তে তার হাতে ছিল সেই কবেকার তার প্রেমিকের লেখা চিঠি। যেখানে সে মেয়েটিকে বলেছিল মেঘে ঢাকা তারা। আর মেয়েটির নাম? নীতা। একে নিয়েই ছবি করতে চান পরিচালক ঋত্বিক। তাঁর তৃতীয় ছবি। এমন এক চরিত্রকে খুঁজে পেতে কলকাতা শহর ঢুড়ে ফেলছিলেন ঋত্বিক। মেয়েটা কালো। কিন্তু তার চোখ গুলি হবে প্রতিমার মতো টানা। সে হাসলে যেন তার ভেতরের কষ্টটাও বোঝা যায়। সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালে যেন মনে পড়ে যায় কবে যেন আমারও এমন এক দিদি ছিল। যার দুঃখে বিনিয়ে বিনিয়ে আগমনী আর বিজয়ার গান বেজে উঠবে। যার সর্বনাশে ঢাকে বোল উঠবে বিসর্জনের। যাকে সিন্ধুবাদ নাবিকের সাথে তুলনা করা যাবে। গৌরীদানে অভ্যস্ত সমাজ তাকে যখন হাড়িকাঠে মাথা গলানোর চেষ্টা করবে তখন যেন বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে। এমন গুণের মেয়েকে খোঁজার দায়িত্ত্ব নিয়ে সবাই যখন তঠস্থ। সারা শহর যখন উথাল পাতাল। কাউকে যখন আর একদম পছন্দ হচ্ছে না পরিচালকের। মন খারাপের বিকেল গুলোয় যখন চেনা মুখের সারি গুলো অচেনা লাগছে। ঠিক তেমনি একদিন সবে অভিনয় করতে এসে অল্প অল্প পরিচিত হওয়া এক অভিনেত্রীর বাড়ি গেলেন ঋত্ত্বিক। সবে সন্ধ্যের রেশ মেখে তাঁর নায়িকা নীতা যেন তৈরী ছিল। তার স্বাভাবিক নিজের ছন্দে। হিন্দুস্থান পার্কের নতুন ফ্ল্যাটে। সবে মাত্র আম্রপালী মুক্তি পেয়েছে। দেবদাসীর ভূমিকায় অভিনয়। অসাধারণ নেচেছে মেয়েটি। কেউ কেউ কথা বলছে অভিনয় নিয়ে। কয়েকজন পরিচালক, প্রযোজক খোঁজ নিচ্ছে। সেই স্বল্প পরিচিত অভিনেত্রীও আস্তে আস্তে স্বপ্নের লাগাম দেওয়া ঘোড়াটাকে যেন দৌড় করাচ্ছেন মনে মনে। ঠিক এমনই এক সময়ে পরিচালক ঋত্ত্বিক যেমন খোঁজ পেলেন নীতার। তেমনি উলটো দিকে অমরত্ত্বের বাসনায় নায়িকা খোঁজ পেলেন চরিত্রের। এরপর থেকে আমাদের প্রাত্যহিকতায়। আমাদের গেরস্থালীতে। আমাদের দুঃখে। আমাদের বাংলা ছবির ইতিহাসে চিরকালের জন্য জায়গা করে নিলেন সুপ্রিয়া। তিনি সাজলেন নীতা। তাঁর দুঃখে বিশ্ব কাঁদলো। তার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকানোয় সিনেমা পেল নতুন ভাষার খোঁজ। তার বড় বড় চোখ তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ালো বাঙালীকে আজীবন। তাঁকে অমর করে রাখলো এক সব হারানো পরিচালকের মাত্র দুটি ছবি ‘মেঘে ঢাকা তারা’ আর ‘কোমল গান্ধার’। নীতা আর অনসূয়া হয়ে দাঁড়ালো জ্যান্ত আইকন বিশ্বের ছবির ইতিহাসে। চল্লিশটার বেশী ছবি, থিয়েটার, সিরিয়াল, জাতীয় পুরষ্কার সব কিছুকে ছাপিয়ে থাকলো এক মনকেমন করা নায়িকা বাঙালীর মানসপটে। স্টুডিও পাড়ায় বসন্তের নতুন পাতা ওঠার বিকেল বেলায়। 

ঠিক কেন এমন ভাবে শুরু করলাম? এক হারিয়ে যাওয়া মেয়ের গল্প দিয়ে? এক সব হারানো পরিচালকের এক অমর চরিত্র দিয়ে? কারণ আমাদের নায়িকারও কি ছিল না সব কিছু পেয়েও না পাওয়ার জীবন? তাঁকেও কি অবজ্ঞা আর অপমানের রাস্তা পেরোতে হয়নি? বারবার এসে পড়েনি জীবনের কষাঘাত? ঠিক রুপালী পর্দার মতোই যে ছিল তাঁর জীবনেরও গল্প। কাজেই বালীগঞ্জের এক ছোট্ট ফ্ল্যাটে যখন জানলার ধারে চুপটি করে বসে আমাদের নীতা গুনছে তার মৃত্যু প্রহর। বুঝতে পারছে এই যে জীবনের উৎসব তার রূপ রস স্পর্শ গন্ধ মেখে এবার চলে যাবার সময় ঠিক তার অনেক আগে। অনেক অনেক আগে লিখে রেখে গেছেন নিজের সব কিছু একটি বইতে। যে বই বাজারে আসার পরেই প্রায় নিঃশেষিত হয়ে যায়। সেই ‘আমার জীবন আমার উত্তম’ কেন তার পরেও আর পুনপ্রকাশ হয় না? সব কিছুর রক্তক্ষরণ সবার সামনে ধরা পড়ে যাবে বলে? নাকি কঠিন সত্যি গুলো এখন আমরা শুনতে চাই না? নাকি ফুরিয়ে গেছে সুপ্রিয়া উত্তমের সেই রোমান্টিক ম্যাজিক? তাদের গেরস্থালিতে উঁকি দেওয়ার উৎসাহ? মনে হয় তেমনটাও নয়। আসলে উপেক্ষাও এক ধরনের অপমান। যে অপমান সহ্য করতে হয়েছে চিরটাকাল আমাদের নায়িকাকে। ঠিক নীতার মতোই। একা। 

যিনি ছিলেন মহানায়কের ঘরনী। যিনি ছেড়ে এসেছিলেন হিন্দি ছবিতে তাঁর অভিনয় করার, প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চরম সুযোগ। যাঁকে নায়িকা হিসেবে পাওয়ার জন্য ঘোড় দৌড় দিতেন প্রযোজকরা। তিনি কেমন করে একা হবেন? ঠিক যেমন করে একা হয়েছিলেন জন্মের সময়। মেয়ে হয়েছে বলে মায়ের ক্ষোভের কারণ হয়ে। অতগুলো ভাইবোনের মধ্যে অভিনয় করার শখ নিয়ে। নিজের জীবনে নিজের পছন্দ মতো পুরুষ নির্বাচনে। তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার মুহূর্তে। মহানায়ককে নিজের জীবনের সঙ্গী হিসেবে বাছার চূড়ান্ত লগ্নে। সঠিক অর্থে জীবনের প্রতিটা মুহূর্তে তাঁকে একা হয়ে যেতে হয়েছে। কারণ তিনি চলেছিলেন স্রোতের বিপরীত মুখে। অসম সাহসিকতায়। মমত্ত্বে। জীবনকে এক গন্ডুষে পান করে নেওয়ার বাসনায়। এই চারিত্রিক লক্ষণ যার থাকে, সীমাকে অসীম করে যাঁরা বাচতে ভালোবাসেন তাঁরা তো একা হবেন। এই একাকিত্ত্ব তাঁকে আর বিঁধতো না। যদি না চব্বিশে জুলাই ভরা বর্ষার দিনে মহানায়কও চলে যেতেন তাঁকে ছেড়ে চলে যেতেন চিরকালের জন্যে। এই একটা মানুষের জন্য যেন সারা জীবন উজাড় করা ছিল তার। ছোট থেকে যখন অভিনয়ের আকাঙ্খা মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে ঠিক তখন থেকেই কি আর একজন মানুষের জন্য মন উথাল পাথাল করছে না। তাকে যে মন চেয়ে বসে আছে অনেক দিন। এক বৈশাখে দেখা হল দুজনার...যে গল্প সে তো চললো তাকে নিয়ে জীবনের শেষ দিনেও। কাজেই যখন চির নিদ্রায় শুয়ে আছেন মহানায়ক। বাইরে বৃষ্টি। মনের ভেতরেও। তখন অন্যদিকে আর এক মানুষের জীবনে নেমে আসছে একাকিত্বের বাঁধন হারা ছায়া। যে “আমি চেয়ে চেয়ে দেখি সারাদিন/ আজ ওই চোখে সাগরের নীল” তাকেও তো হারিয়ে যেতে হচ্ছে এক অসীম অন্ধকারের অতলে। কষ্টে। তাঁর দিকে ধেয়ে আসছে অসংখ্য অভিযোগের তীর। তখন তো তাঁদের জীবনের ভালোবাসা, প্রেম, সংসার যাপন সকলের চর্চার বিষয়। বাঙালীর অন্দরের ফিস-ফিস গল্প। এক না দেখা শূন্যতার জমাট বাঁধা কানাকানি।
ঠিক এখানেই থেমে যেতে পারতেন সুপ্রিয়া দেবী। ঠিক এখানেই হয়তো শেষ হয়ে যেতে পারতো তাঁর জীবন। কিন্তু এখানে থেমে থাকতে চাননি তিনি। মনের মধ্যে একা এক মানুষের স্মৃতি আঁকড়ে তিনি ছুটে চলেছিলেন আরও অনেক দিন। ক্লান্ত বিস্মৃত সেই মানুষটা ইদানিং জানলার ধারে বসে থাকতেন। একটু আলুপোস্ত, একটু ভাত। তার সাথে জড়িয়ে থাকতো স্মৃতি। ১৯৯৯ সালে বহু চর্চিত “আমার জীবন আমার উত্তম” আত্মজীবনী তিনি শুরু করেছেন সেই একাকিত্বের কথা বলে। নিজের মনের মানুষটাকে স্মরণ করে। যার জন্য মনের মধ্যে বুনে চলেছিলেন এক সময়ে এক নক্সা করা রঙীন স্বপ্ন। যার জন্য সব কিছু একদিন ছেড়ে এসেছিলেন। বিসর্জন দিয়েছিলেন অনেক চাওয়া-পাওয়া। তিনি লিখলেন, “কোনও দিনও কি ভেবেছিলাম, আমার জীবনের সঙ্গে জড়িত আমার আমিকে ঘিরে, আমার একাকিত্ত্বকে ঘিরে, আমাকেই অনেক কিছু লিখতে হবে? লিখতে হবে এতোদিন ধরে বুকের মাঝে সযত্নে লালিত আমার একমাত্র আশা, ভরসা, আর উপাস্যের কথা? সেদিন আমার বয়েস কত ছিল? কত বড় ছিলাম আমি, যেদিন তিনি আমার জীবনে শরতের আকাশে সাদা সাদা পেঁজা তুলোর ফাঁকে ফাঁকে নীল আকাশের ছায়া ফেলা শুরু করেছিলেন?”

নাম ধরে কোনদিন ডাকেননি মনের মানুষকে। ওগো, হ্যাঁগোর মধ্যে জড়িয়ে ছিল সংসারের মন কারুবাসনা। যে সংসার করতে চাওয়া সেই যে ছোট্ট বয়সে। খেলনা বাটির হারিয়ে যাওয়া দিনে। শ্যুটিং করতে এসে। প্রথম দেখা হবার ফাগুন হাওয়ায়। ময়রা স্ট্রিটে সংসারের বয়েস তো প্রায় সাতেরো বছর। সেই দীর্ঘ দিনের দুটো মানুষের যাপনের দিনলিপি একজন বেঁচে থাকা মানুষ বয়ে নিয়ে চলে অনবরত। মনে হয় এই বুঝি ডাক এলো পাশের ঘর থেকে। “বেনু এক কাপ চা করতে বলো তো।” এই বুঝি কেউ কোলের ওপর পাশবালিশ নিয়ে অপলক তাকিয়ে থাকলো। চেনা ঠোঁট, সিগারেট, চেনা পারফিউম, আড্ডার হইহই, নতুন ছবির প্রিমিয়ার, স্ক্রিপ্ট পড়া, সব কিছু যেন উড়ে বেড়ালো উড়ো প্লেনের মতো। খাবার টেবিলে খাবার রইলো পড়ে। বইয়ের তাক থাকলো পাঠক হীন। ব্যালকনি, ঘোরানো সিঁড়ি, পাতা বাহার গাছ তাদের মতো করে হারিয়ে ফেললো একটা মানুষকে। সময়কে। এমন এক দিক শূন্যপুরের উদাস বয়ে যাওয়া হাওয়ায় একাকী গা ভাসালেন আমাদের মেঘে ঢাকা তারা সুপ্রিয়া দেবী। জীবনে চল্লিশটার বেশী ছবি, অনেক নাটক, থিয়েটার, সিরিয়াল করে এই তো ২৬ জানুয়ারীর এক কুয়াশা ঘেরা সকালে ঘুমিয়ে পড়লেন চিরকালের জন্য। কিন্তু রেখে গেলেন অনেক অভিমান নিয়ে অনেক খোলা চিঠি, ছবি, জীবন নামক উৎসবের পরতে পরতে সাজানো এক চিত্রমালা। 

কিন্তু শুরুটা তো ছিল এক ঝলমলে আলোর দিনের মতোই। গিরিশ মুখার্জি রোডের জয়হিন্দ নামের যে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন সুপ্রিয়া দেবীরা সেই বাড়িতেই প্রথম উত্তমকুমারের সাথে তাঁর দেখা। তখন বয়েস মোটে এগারো। তারও বেশ কিছু দিন পরে যখন বার্মা মুলুক থেকে পাকাপাকি ভাবে চলে এলেন তাঁরা হঠাৎই একদিন ট্রামের মধ্যে দেখা দুজনের। সেদিনের সেই দেখার কথা বলতে গিয়ে অভিনেত্রী লেখেন, “লাজুক চোখে লাজুক অপ্রস্তুতের হাসি। আমার দিকে এক ঝলক মিষ্টি হাসির ঝলকানি। ও মা! চলন্ত ট্রাম থেকে লাফিয়ে নেমে পড়লাম। কী হলো আমার? বুকের রক্ত আমার কেন মুখে উঠে এসে আবিরে আবিরে সারা মুখ রাঙিয়ে দিচ্ছে। তবে কি ট্রাম থেকে ঝাঁপিয়ে পড়বো আমি? এরপর আবার যে দেখা হবে বুঝেছিলাম কি কখনও? দেখা হল একটি বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে, দেখা হল সদ্য এক পুত্রের পিতার সঙ্গে। আগের মতো বুকের ভিতরটা দাপাদাপি করলো না। ঝলকে ঝলকে বুকের রক্ত আবির রাঙা হয়ে সারা মুখে ছড়িয়ে পড়লো না। ঘন শান্ত স্নিগ্ধ অবনত লাজুক মুখে চেয়ে রইলাম আমি।” ঠিক এর পরেই দেখা হয়ে গেল বসু পরিবারের সেটে। এম পি প্রো্ডাক্সানের ছবি। মালিক মুরলীধর চট্টোপাধ্যায়। এই প্রথম শ্যুটের মাঝে এতো কাছে আসার সুযোগ পেলেন আমাদের নায়িকা। না তখনও তিনি নায়িকা হয়ে ওঠেননি। আর যাকে দেখে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছিল সেই অরুণকুমারও তখনও উত্তম হয়ে মহানায়ক হয়ে ওঠেননি। অনেকে তাকে বলতে শুরু করেছে ফ্লপ মাস্টার জেনারেল। কিন্তু মানুষটাকে যে পছন্দ করে মেয়েটি। অনেক কষ্টে বাড়ির লোককে রাজী করিয়ে, বাবাকে রাজী করিয়ে একটা ছোট্ট রোলে অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছে। আর আনন্দে মাতোয়ারা হয়েছে, কারণ মনের মানুষটি তার দাদার চরিত্রে অভিনয় করছে। সেই সেদিনের ঘটনাটা অনেক দিন মনের মধ্যে আঁকিবুঁকি কেটে গেছে নায়িকার। তিনি বলছেন, “হঠাৎ একদিন শ্যুটিং চলছে, একটি দৃশ্যের শ্যুটিং। বড় ভাই (উত্তমকুমার) বোনকে (সুপ্রিয়া) একটি শাড়ি উপহার দিয়েছে। শাড়িটা পড়বার পর উত্তমের সংলাপ, তোকে শাড়িটা পড়ে সুন্দর দেখাচ্ছে(শাড়ির আঁচল ধরে)। বোনের সংলাপ হবে (খুশি হয়ে) সত্যি বলছো বড়দা? কিন্তু সেই সংলাপ মুখ দিয়ে বেরোলো না। লজ্জায় মুখ রাঙা হয়ে গেল। আঁচলটা এক টানে ছাড়িয়ে নিয়ে মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো যাও। ভুলে গেলাম এটা স্টুডিও। ভুলে গেলাম আমি অভিনয় করছি। সন্ধ্যেবেলা শ্যুটিং প্যাক-আপের পর মেক-আপ রুমে আয়নার দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে আছি। নিজেকে দেখছি আর দেখছি, হঠাৎ সমস্ত শরীরটা কেঁপে উঠলো। আমি বড় হচ্ছি। আমার শরীরে পরিবর্তন আসছে। নিজের অজান্তে কপালে ছোট করে কুমকুমের টিপ পড়লাম। দরজায় আওয়াজ। সামনে দাঁড়িয়ে ও। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, টিপ পড়লে যে? কোথাও বেড়াতে যাবে নাকি? বুকে আবার ঢিপ ঢিপ গুড় গুড় শব্দ। ঝলকে ঝলকে বুকের রক্ত সারা মুখ সিঁদুর রঙে রাঙিয়ে দিল।  বয়স তখন কত আমার? সতেরো নাকি আঠারো? জীবনের শুরুতে হৃদয় গ্রন্থিতে প্রথমে কে করাঘাত করেছিল? আমি না ও? এই ইতিহাসের শুরু ঊনিশশো পঁয়তাল্লিশে। এই ইতিহাসের যবনিকা ঊনিশশো আশি সালের চব্বিশে জুলাই। এই আমার কাহিনী। আমার এই জীবন শুধু তো ওকে ঘিরেই। এটাই এই জীবনের ভুমিকা। এটাই আমাদের জীবনের যবনিকা।” না আমরা জানি এখানেই শেষ হয়নি তাঁর পথ চলা। এরপরে বার বার তাকে ফিরে আসতে হয়েছে কাজের জায়গায়। খবরের কাগজে হেড লাইনে। দুই পরিবারের টানা পোড়েনে। তবু স্মৃতি চারণা শেষ হয়নি। কাজের ধারাবাহিকতাও।
১৯৫২ সালে প্রথম ছবিতে অভিনয়। শুধুমাত্র উইকিপিডিয়া বলছে সাতচল্লিশটির মতো ছবি। এর মধ্যে অনেক উল্লেখযোগ্য ছবি উত্তমকুমারের সাথে। আর বেশ কিছু ছবি তার পরের কার। কিন্তু এইসব কিছুর মধ্যে আছে ‘আপ কি পরছাইয়া’ (১৯৬৪) আর ‘দূর গাঁও কি ছাও মে’ (১৯৬৪)। প্রথম ছবিটি ধর্মেন্দ্রের সাথে। আর দ্বিতীয়টি কিশোরকুমারের সাথে। আপ কি পরছাইয়ার গান গুলি মানুষের মনকে ছুঁয়ে গিয়েছিল। সেই সময়ে একটু একটু করে যখন বোম্বের মাটিতে নিজের জায়গা করে নিচ্ছিলেন তখন শুধু একজন মানুষের ভালোবাসা তাঁকে টেনে রাখলো কলকাতায়। ঠিক করেছিলেন থেকে যাবেন বোম্বেতে। ফ্ল্যাট দেখা হয়ে গিয়েছিল। নেওয়া হয়েছিল। সাজানোও চলছিল টুকটাক। মেয়েকে বোর্ডিং এ রাখা। বোম্বেতে নিজের সেক্রেটারি সব কিছু একটু একটু করে গোছাতে শুরু করেছিলেন। সাহায্য করছিলেন বিখ্যাত সুরকার, গীতিকার সঙ্গীত স্রষ্টা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। দাদার মতো হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন বোনের দিকে। কারণ তখন তো বোনটি বড় একা। স্বামী ছাড়া। সংসার ছাড়া। গৃহের স্নেহ ছাড়া। আর একদিকে আছে একটা মানুষকে ভালোবসার এক অগ্নীপরীক্ষা। কিন্তু হাতে তখন তো অনেক কাজ। অনেক অনেক কাজ। কলকাতা বোম্বে করতে হচ্ছে তাই নিয়মিত। পেইং গেস্ট থাকলেন কিছুদিন আমাদের নায়িকা। হ্যাঁ কলকাতাতেই। শেষবারের জন্য কলকাতা ছাড়ার প্রস্তুতি। সব ঠিকঠাক। হাতে প্লেনের টিকিট। কলকাতার পেইংগেস্ট বাড়ির ভাড়ার রিসিট। সারাদিন বড় ক্লান্তিতে ঘুরে বেড়িয়েছেন শহর। অনেক কাজ, অনেক অভিমান, মন কেমন নিয়ে যে ছাড়তে হচ্ছে শহর তাকে। কিন্তু বাড়ি ফিরে আসার পর দেখলেন কেউ যেন তাঁর জন্য অপেক্ষা করছেন। কেউ যেন সোফায় গা এলিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন তাঁর আসার অপেক্ষায়। ঘরে ঢুকে চমকে উঠলেন সে তো আর কেউ না। যার জন্য তিনি অপেক্ষা করে গেছেন জীবনের প্রতিটা প্রহর। যার কাজের ক্ষতি না হয় ভেবে ছাড়ছেন তাঁর প্রিয় শহর। সেই মহানায়ক আজ তাঁর বাড়িতে? যাওয়া হয় না আর বোম্বে। কারণ তার কানে কানে বলে গেছেন তিনি, “না না আমাকে ফেলে কোথাও যাবে না তুমি। তুমি চলে গেলে আমি মরে যাবো। আমি বাঁচবো না। আমাকে বাঁচতে দাও।” এক নিগূঢ় প্রেমের বন্ধনে আটকে গেলেন সুপ্রিয়া দেবী। অনেক দিন পরে যখন সেই ফিরে পাবার স্মৃতিবাসনা জাগলো তাঁর মনে তিনি লিখলেন, “আমি স্তব্ধ। বিস্মিত। আমার সব রক্তকণা সারা মুখের ওপর ছোটাছুটি করছে। না ওকে ঠেলে সরিয়ে দিতে পারলাম না। একটি পুরুষের সব হাতের মুঠোয় বন্দী আমি। একটি তৃষ্ণার্ত পুরুষের ঘন সান্নিধ্যে বন্দিনী আমি। এক শূন্যতার মহা সলিলে ডুবে যাচ্ছি আমি। এতোদিন শিরায় শিরায় যে শিখা জ্বলে জ্বলে উঠতে চেয়েছিল, আজ বুঝি তার পরিসমাপ্তি ঘটলো। ঘর শান্ত হলো। বাতাস শান্ত হলো। আমাকে ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। শ্রান্ত ক্লান্ত অবশ শরীর নিয়ে শুয়ে রইলাম। ভুলে গেলাম আমার বোম্বে যাওয়া। ভুলে গেলাম আমার ভবিষ্যত। ক্লান্ত চোখের সামনে চারশো টাকার রসিদ টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে আছে। প্লেনের টিকিট দুমড়ে মুচড়ে পড়ে আছে। আমি ভেসে গেলাম। সময় তো অস্থির। এবেলা-ওবেলা পাতা ঝড়ে পড়ে। ক্যালেন্ডারের তারিখ বদলায়।...সারারাত চোখের জলে বিছানা ভাসিয়েছি। আমার ভালো মন্দ, বর্তমান ভবিষ্যৎ, আমার সুখ-দুঃখ একটা অজানা হাত এসে যেন কেড়ে নিয়ে গেল। ... হ্যাঁ আমি ধরা পড়লাম। ধরা দিলাম। আমি পাগোল হলাম ওর রূপে, পাগোল হলাম ওর প্রেমে। পাগোল হলাম ওর ভালোবাসায়, হ্যাঁ আমি নতুন করে ভালোবাসার ভেলায় ভেসে গেলাম। এতোদিন ধরে  যে ধিকি ধিকি আগুন সারা বুক জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দিচ্ছিল, সেইদিন সেই বেলা তিনটের সময় বসন্তের কোকিল ডাকা দুপুরে বুকের ভেতরের সেই ধিকি ধিকি আগুনে জ্বলে পুড়ে যাওয়ার বুঝি সমাপ্তি ঘটলো। নাকি নতুন করে আমার জীবনের বিষ বৃক্ষের বীজ বপন হল, অনেক টাকা লোকসান হলেও বোম্বের ফ্ল্যাট ছেড়ে দিলাম।” 

এতো অকপট স্বীকারোক্তি, এতো দূর থেকে জীবনকে দেখার সাহস জীবনের শেষ বেলায় এসে কজন নায়িকা দেখাতে পেরেছেন তা হাতে গুনে হয়তো বলা যায়। কিন্তু যাঁর জীবনে পাওয়ার ভান্ডার অফুরন্ত তাঁর লোকসানের ভয় থাকবে কী করে? যে মৃত্যু উপত্যকার দেশ পেরিয়ে একদিন সুদূর বার্মা মুলুক থেকে উৎপাটিত হয়ে এসেছিলেন। যাঁর জীবনের প্রতিটা মোড় নাটকীয়, এবং সাদা পর্দায় যে কোন লেখকের ঈর্ষা ধরানোর মতো টানটান চিত্রনাট্য তাঁর হঠাৎ এক শীতের সকালে, তাঁর জন্মমাসে চলে যাওয়াটা বড় অভিমানের। হয়তো সে অর্থে বড় একাকিত্ত্বের। আমরা তাঁকে সব কিছু দিতে পেরেছিলাম কী? ঝুলি ভর্তি ছিল পারিতোষিকে। কাজের তালিকা ছিল দেখার মতো। বেশ কিছু দিন আগে পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে তাঁকে অশক্ত শরীরে। যদিও বর্তমান সরকার তাঁকে দিয়েছে শেষ বয়সের নিশ্চয়তা। শান্তিতে বেঁচে থাকার আশ্বাসটুকু। আমরা চিনেছি তাঁকে বেনুদির রান্নাঘরে। কিন্তু চিনিনি আরও অনেক কিছুতে। চিনিনি এক নির্ভীক মানুষ হিসেবে। আমরা তাঁকে চিনিনি তাঁর সময়ের ফ্যাশান সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন এক নায়িকা হিসেবে। সুপ্রিয়ার সাথে গেরস্থালির আগে এবং পরের উত্তমকুমারের ছবিতে পোষাক, ফ্যাশন স্টাইল দেখলেই তা স্পষ্ট বোঝা যায়। ভালোবাসার প্রহরে, বাঁচার স্বপ্নে তিনি আমাদের সবাইকে টেক্কা দিতে জানেন। জীবনের উৎসবের রঙ্গমঞ্চে তিনি আমাদের সবটুকু উজাড় করে দিতে চেয়েছিলেন। আমরাই শুধু তাঁকে, আমাদের মধ্যবিত্ত মানসিকতার বেড়া জালে আটকে অনেক দূরে সরিয়ে রাখলাম। একা। প্রায় নির্বাসিতের মতো। সে অর্থে সত্যিই তিনি নীতা। গৌরীদানে অভ্যস্থ সমাজের শেষ অঞ্জলী। আমাদের কাছে এক অন্য মেঘে ঢাকা তারা। 

সূত্র :


আমার জীবন আমার উত্তম- সুপ্রিয়া দেবী, মডেল পাবলিশিং হাউজ।
ছবিঃ গুগুল ইমেজ, ইউ টিউব।
লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল 'রোজকার অনন্যা' পত্রিকার ফেব্রুয়ারি,২০১৮ সংখ্যায়।