ঠিকানা লেখা নেই_৯


 কেউ কোনো বই দিলে আজকাল বড় ভালো লাগে। ছোটবেলায় মনে হতো এটা একটা ষড়যন্ত্র। একটা না পড়তে ভালো লাগা ছেলেকে জোর করে পড়াশুনো করানোর চেষ্টা। বইটা নিজের তাকে না রেখে দাদার কিম্বা বাবার তাকে রাখতাম। অথবা মাকে বলতাম একটু পড়ো দেখি। তোমার গল্প পড়াটা কি সুন্দর। বাড়ির লোক অচিরেই ধরে ফেলতো আমার কারসাজি। জোর করে রীতিমতো রুটিন করে পড়ানো হতো আমাকে বই। একফালি রোদ এসে দরজায় পড়লে সেখানে বসে যেতাম। সেখানেই আমার সাথে কতজনের যে ভাব হয়ে গেল। আড়ি হলো। আগডুম বাগডুম খেললাম সেসব ভাবতে অবাক লাগে।

এখন আমাকে শিক্ষিত করে তুলতে জয়াদি আর দেবালয় মাঝে মাঝেই বই দেয়। হ্যাঁ এখনও। পড়া ধরার মতো করে না হলেও জানতে চায় পড়লাম কিনা। কি মনে হলো। আমিও অফিস যাওয়ার পথে ট্রেনে, মেট্রোয়, টোটোয় এমনকি যে ছেলেটা বাইকে পেছনের সিট ভাড়া দেয় তার সাথে যেতে যেতে বকবক করতে করতে নিজের মনের মধ্যে পড়া তৈরি করি। আর একটা একটা করে বই বালিশের পাশে, অফিসের টেবিলে , ল্যাপটপের ব্যাগে সঙ্গ করে।
"আজ সাতাশ দিন হল/একটা লোক আমার কবিতার লাইনের বাইরে দাঁড়িয়ে।/ ময়লা ধুতি পরা, বাড়ি বাড়ি /মুড়ি বিক্রি করা একটা লোক।" এক ঝটকায় অনির্বাণের 'গাবলু ও সুপারম্যান' কেমন যেন নাড়িয়ে দিয়ে যায় ভেতর থেকে। এমনটা নয় যে আমার তেমন কবিতা পড়া বা চর্চা করার অভ্যাস আছে। কিন্তু যে দৃশ্যপুঞ্জ একজন কবি শব্দ দিয়ে নির্মাণ করছেন তার দিকে আমার বরাবরের লোভ। হাত পেতে নিয়ে চেটেপুটে খেতে ইচ্ছে করে। অনির্বাণ এই শহরকে এক অসম্ভব লাশ কাটা ঘরের মতো মায়ায় দেখেন। "কলকাতা শহরে আজকাল/ টাইলসের ব্যবহার বেড়ে যাচ্ছে।/ এরফলে বাথরুম বা রান্নাঘরে/ কোনো দাগ আর দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না।" আর মৃত্যু? "আসলে গোটা পৃথিবীই বিক্রেতা/ক্রেতা সেই লোকটা যে বসে আছে/ গড়িয়ার ঘুপচি দোকানে।/ এই সত্য জানার পর/ কী কিনিতে হইবে লিস্ট ফেলা গেল।/ নতুন লিস্ট- আমার কী বেচার আছে।" এমন অজস্র মোড় মাত্র চৌষট্টি পাতার মধ্যে জমিয়ে রাখেন অনির্বাণ। নির্মাণ করেন আমাদের জন্য এমন একটা জগৎ যেখানে মন কেমন করে। যে দৃশ্য রোজ দেখি তাকে ফিরে পড়তে ইচ্ছে হয়। মনে হয় কবিতা এখনও বেঁচে আছে।
বেঁচে তো আমাদের থাকতেই হবে। মৃত্যু অনেক সোজা। আমার যে বন্ধুটা এই কথা বারবার বলতো। বিশ্বাস করাতো। সবার মধ্যে পিকনিকে, বেড়াতে গেলে হইচই করতো সেই অনেক অভিমানে, কষ্টে নিজেকে আর বাঁচিয়ে রাখেনি। একবন্ধু বলেছিল অনেক ভোরে ফোন করে দীপেন এবারের সপ্তমীর সকালটা আর দেখতে পেল না। আমরা হারা বা জেতার একটা তুলনামূলক সন্ধি করতে চাই হয়তো জীবনে। সেই ছোট্টবেলা থেকেই। প্রেমে হার। কাজের জগতে। বেঁচে থাকতে চেয়ে। এমনকি দুজন মানুষ যখন দুজনকে আঁকড়ে ধরে তখনও। এবারও দ্বারভাঙা জেলা থেকে যে ছবিটা মুবিতে এসেছে সেটাও আমাকে চমকে দিয়েছে। 'পোখার কে দুনু পার' ( Pokhar ke dunu paar) । বাংলায় যদি বলতে চাই তাহলে পুকুরের দুই পার। নামটা আর ছবিটা যখন ল্যাপটপের স্ক্রিনে ভেসে উঠলো তখন বড় দেখতে ইচ্ছে করলো ছবিটা।

এর আগে তো আমরা অচল মিশ্রের গামক ঘর দেখেছি। ধুঁই দেখেছি। এবার তার বন্ধু পারথ সৌরভ নির্মাণ করেছেন এমন একটা সময় যেখানে মানুষ মানুষকেও বিশ্বাস করতে পারছিল না।
ঠিক দুই বছর আগে। কোভিড চলাকালীন সুমিত আর প্রিয়াঙ্কা ফিরে আসে তাদের পুরনো শহরে। যে শহরে এখন স্মৃতি ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নেই। প্রিয়াঙ্কার বাবা মা সুমিতকে পছন্দ করে না। আর সুমিত ছাড়া প্রিয়াঙ্কা থাকতে পারবে না। তাদের যে বিয়েও হয়নি। লিভিং করে তারা। এভাবে কেউ কি এমন এক মফস্বলে থাকতে পারে? সুমিতের চাকরী নেই। প্রিয়াঙ্কার কলেজ বন্ধ। উঠেছে তারা কমিউনিস্ট পার্টির এক ভাঙাচোরা অফিসে। এক বন্ধুর কল্যাণে। সেখানেই তাদের একটা স্টোভ, একটা হাঁড়ি, একটা থালার সংসার। এক বৃষ্টি ধোয়া শহরে সুমিত চাকরী খোঁজে। প্রিয়াঙ্কা আশায় বসে থাকে কবে তার কলেজ খুলবে। একে একে দুজনের সংসারে সব বিক্রি হতে থাকে। তবুও কেমন এক মন কেমন করা ছবির আবহে বেঁচে থাকে তাদের ভালোবাসা। জীবন। আর এক টুকরো বেঁচে থাকা। অনেক দিন পর একটা ছবি দেখে মনে হয় অনেকটা পথ হাঁটি। অনেকটা কথা বলি। ঠিক তখনি না শীত আসা শহরে সন্ধ্যে নামে। আমার কাঁচের ঘরে রাখা গাছগুলো আপ্রাণ চেষ্টা করে আলোর দিকে মুখ ফেরাতে। কখন আবার সূর্য উঠবে। ধুইয়ে দিয়ে যাবে ঘরটা।
পারলে বইটা পড়ে ফেলুন। আর ছবিটা দেখে নিন মুবিতে। ভালো থাকবেন সক্কলে।

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় লেখা গুলি