অসময়ের মানবিকতার দলিল

 

ছবিটা একটা থ্রিলার হতে পারতো। কিম্বা সম্পূর্ণভাবে এক অন্যমাত্রার স্যাটায়ার। নিখাদ রাজৈতিক কচকচানি বা তাত্ত্বিক বুলি আওড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ ছিল। অথবা একান্ত ব্যক্তিগত হাহাকার। কিন্তু এর কোনদিকেই ছবিটা গেল না। বরং এক চিরাচরিত মূল্যবোধ আর মানবিকতার রাস্তায় হাঁটলো। অথচ পরিচালক গত এক দশক কোনো সুস্থির পরিস্থিতির মধ্যে ছিলেন না। রাজনৈতিক বন্দি। কখনো জেলে কখনও বা নিজের বাড়িতে। ইরানে এই যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে কেমন আছেন জানি না। কোথাও তার কোনো খবর নেই। হ্যাঁ আমি পরিচালক জাফর পানাহি সম্পর্কে বলছি। তার নতুন ছবি 'ইট ওয়াজ জাস্ট এ্যান এ্যাক্সিডেন্ট' সম্প্রতি মুবিতে মুক্তি পেয়েছে। গোটা বিশ্ব অবাক হয়ে দেখেছে তাঁর এখনকার ভাবনা। তাঁর চলচ্চিত্র দর্শন।

ছবিটি পরিচালককে তাঁর দেশেই লুকিয়ে শ্যুট করতে হয়েছে। ঠিক এর আগেও বেশ কয়েকটা ছবি যেমন করতে হয়েছিল। কাজেই গত বছর কান চলচ্চিত্র উৎসবে যখন অপ্রত্যাশিত ভাবে একদম শেষ মুহূর্তে ছবিটি অংশ গ্রহণ করে এবং শ্রেষ্ঠ ছবির সম্মান পায় তখন গোটা পৃথিবীর মতো আমাদেরও অবাক করেছিল। মনে হয়েছিল আসলেই কোনো প্রতিকূলতাই কোনো শিল্পের ভাষা প্রকাশের পরিপন্থী হতে পারে না। জাফর পানাহির যাঁরা কাজের ভক্ত তাঁরা জানেন কিভাবে গৃহবন্দী অবস্থায় একদম নিজের ওই এপার্টমেন্টের মধ্যে একমাত্র নিজে ক্যামেরার সামনে অভিনয় করে একটা ছবি আমাদের তিনি উপহার দিতে পেরেছিলেন। দিস ইজ নট এ ফিল্ম তাই যেকোনো চলচ্চিত্র প্রেমী এবং অনুশীলন ছাত্রের একটা টেক্সট বই তো বটেই।

তাঁর ছবির চরিত্ররা নিতান্ত ছাপোষা মানুষ। কাজের টানে, পেটের টানে তাদের যে দৈনন্দিন যাত্রা সেটাই যেন গল্পের এবং ছবির চলন হয়ে ওঠে। আর তার সঙ্গে কি মারাত্মক ভাবে জড়িয়ে থাকে তীব্র শ্লেষ। এক রাজনৈতিক দর্শনের চোরা স্রোত। লাতিন আমেরিকার চলচ্চিত্রের ইতিহাসে দেখা যায় অনেক বিখ্যাত পরিচালককে দেশের বাইরে থেকে লড়তে হয়েছে। সামরিক শাসন উৎখাত করেছে তাদের। এই প্রসঙ্গে স্মরণ করতে হবে মিগুয়েল লিতিন সমেত একগুচ্ছ পরিচালককে। ক্যামেরা শুধু তাঁদের কাছে একটা পেন নয় বন্দুক হয়ে উঠেছিল কোনো কোনো সময়।

এই ছবির গল্প এক অবসর প্রাপ্ত কুখ্যাত সামরিক কর্তাকে অপহরণ করার মধ্যে দিয়ে আবর্তিত হয়। যিনি এখন পঙ্গু। যার বিষ দাঁত, নখ আর কিছুই চোখে পড়ে না। তাকে যারা বিলুপ্ত করতে চেষ্টা করে তারা একদিন এই লোকটির অত্যাচারে ধ্বস্ত। এমনকি জীবনগুলোও ছাড়খার হয়ে গেছে। তারা কারা? একজন গাড়ির মেকানিক, একজন চিত্র সাংবাদিক যিনি এখন বিয়ের ছবি তুলে বেড়ান, একটি মেয়ে যে নতুন করে চেষ্টা করছে ঘর বাঁধতে আগামীকালই যার বিয়ে। যাকে রেপ করা হয়েছিল এই সামরিক কর্তার তত্ত্বাবধানে। এইরকম বেশ কিছু লোক। আর এদের মধ্যে একটা শহর। যে শহরে আপাতভাবে দেখলে কোনো অশান্তি নেই। কিন্তু মিলিটারি চেকপোষ্টগুলো আছে। ঘুষ খাওয়া আছে। প্রশাসনিক হুমকি আছে। কাজ না পাওয়ার হতাশা আছে।

it was just an accident

পানাহির ক্যামেরা তাই একটা বাড়ি, একটা গাড়ি, গাড়ির মধ্যে থেকে শহরের পথঘাট, একটা ঊষর প্রান্তর, কিছু ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ছাড়া আর কিছু দেখায় না। বরং বলা ভালো দেখাতে পারে না। কারণ তিনি চানও না। লুকিয়ে গল্প বলতে বসলে এর চেয়ে বেশি কিছু পাওয়া যায় না। কিন্তু এই বিন্দুতে তিনি গোটা পৃথিবীকে সিন্ধু দর্শন করিয়েছেন। ছবিটি তাই নিছকই ইরানের গল্প হয়ে থাকেনি। গোটা পৃথিবীর হয়ে গেছে।

চব্বিশ ঘন্টার সিনেম্যাটিক স্পেস এবং টাইমে যে ছবিটাকে বুনতে বসেছিলেন পরিচালক সেটা হয়তো এই সময়ের চর্চার আরও একদিক খুলে দিতে পারে। এমনকি আলোচনারও। ছবিটির শেষে সত্যিই কি তারা বিলুপ্ত করতে পারে এই নরখাদক সামরিক কর্তাকে? না, বলে দিলে আপনাদের আর দেখার ইচ্ছে থাকবে না। কিন্তু মজার ব্যাপারটি হলো এই ছবিটি গত বছর হলিউডের তাবড় স্টুডিওর ছবিকে পেছনে ফেলে দিয়েছে কনটেন্ট এবং ব্যবসায়িক পরিভাষার দিক থেকে। সেটা নিয়েও কম জলঘোলা আর কানাকানি চলছে না। যাঁরা খোঁজ রাখেন তাঁরা নিশ্চই জানেন।

চারিদিকে এই বিপুল দৃশ্য আর কনটেন্টের জোয়ারে, ভুত প্রেত থ্রিলারের আতিশয্যে ইট ওয়াজ জাস্ট এ্যান এ্যাক্সিডেন্ট যেন গোটা পৃথিবীর কাছে মরুদ্যান। এই সময়ের সিনেমা এবং মানবিকতার দর্শন। ভাবনা এবং চর্চা করারও। ছবিটা দেখে নিন তাড়াতাড়ি। তারপর না হয় আরও আড্ডা দেওয়া যাবে।

মন্তব্যসমূহ

  1. Solid content, and the length feels right rather than padded. The details matter more than the framing here, and the details are largely right. On a separate note, we run industrial cleaning services for bank, NGO and hospital sites:https://topone.com.bd/

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

জনপ্রিয় লেখা গুলি