ভিয়েত এ্যাণ্ড নাম (Viet and Nam)
জন্ম যখন মধ্য সত্তরের জরুরী অবস্থাকালীন পশ্চিমবঙ্গে তখন ভিয়েতনাম শব্দটা শুনবো না তাও কখনও হতে পারে? এক রত্তি থেকে বড় ও বুড়ো হওয়ার সেকাল আর একাল ঘিরে কি জেগে নেই বাঙালির মানসপটে "তোমার নাম আমার নাম ভিয়েতনাম...ভিয়েতনাম"। কিন্তু কেন হঠাৎ ভিয়েতনাম আপামর জনগণের নামের সঙ্গে তাদের লব্জের সঙ্গে জুড়ে যাবে? ওই তো ছোট্ট একটা এক রত্তির দেশ? কারণ তারা শিরদাঁড়া উঁচু করে যুদ্ধ করেছিল এমন একটা দেশের সঙ্গে যারা শুধু মুখের ভাতটুকু ছিনিয়ে নিতে চায়নি। চেয়েছিল স্বাধীকারটাকেও কেড়ে নিতে। রুখে দাঁড়িয়েছিল দেশের মানুষ। সেই উত্তাল সময়টা অনেক ছবিতে, অনেক গল্পে, উপন্যাসে ভিড় করে আছে। এমনকি হলিউডের নাম করা প্রোপাগান্ডার ছবি গুলোতেও। যেখানে বিখ্যাত সব মারকাটারি হিরোরা হারিয়ে দিচ্ছে আসলেই 'শত্রু' গরীব দেশের জঙ্গলে লুকিয়ে যুদ্ধ করা মানুষদের।
কিন্তু সেসব তো বহুদিন আগের কথা। সেই মাথা উঁচু করে যুদ্ধ করা দেশটা এখন কেমন আছে-মুখ হাঁ করে খুলে রাখা বিশ্ব বাজার অর্থনীতির কাছে? হ্যাঁ সেটাই দেখাতে চেয়েছেন ভিয়েতনামের এক তরুণ পরিচালক। যুদ্ধ তো অনেক দিন শেষ। সেইসব আদর্শে যাঁরা বলিয়ান ছিলেন তাঁরা বেশিরভাগই যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত। আর অনেকেই ঘরে ফেরেননি। তাঁদের কোনো ট্রেস পাওয়া যায়নি। ফিরে আসেনি ভিয়েত এবং নাম এই দুই তরুণের বাবাও। যারা এখন পৃথিবীর পাতালে গিয়ে কুড়িয়ে বাড়িয়ে কয়লা খোঁজে। যাদের সারা গা ঢেকে থাকে কয়লার গুঁড়োয়। দারিদ্র তাদের মহান করতে পারে না। ছেড়েও যায় না। আষ্টেপৃষ্ঠে সাপের মতো জড়িয়ে থাকে। তবুও মায়ের স্বপ্নে, যুদ্ধ ফেরত বেঁচে থাকা বাবার বন্ধুর গল্পে বারবার ফিরে ফিরে আসে কবেকার হারিয়ে যাওয়া বাবা। যার মুখ স্পষ্ট দেখতে পায় না ভিয়েত কিম্বা নাম কেউই। এদিকে তারা দুজন দুজনকে যে প্রচন্ড ভালোবাসে। যে ভালোবাসা তার দেশে নিষিদ্ধ। যে সম্পর্ক জানাজানি হয়ে গেলে মুখ লুকোবার জায়গা থাকবে না। হয়তো শেষ পরিণাম মৃত্যু।
পালাতে চায় ওরা দুজনে। কিন্তু কোথায় পালাবে? যে দেশে হারিয়ে যাওয়া পিতার অস্থি মিশে আছে। যে দেশের স্মৃতিতে বারুদের গন্ধ। যে দেশের পটভূমিকায় এখন শুধুই বিশ্ব বানিজ্যের দখল। পরিচালক মিন কুয় ট্রুং এর ক্যামেরা ঘোরাফেরা করে কয়লা খনির গভীর অন্ধকারে। যুদ্ধ মিউজিয়ামে। ভিয়েতনামের পালটে যাওয়া শহরে। যুদ্ধ স্মৃতিতে ভারাক্রান্ত অরণ্যে। প্রাচীন প্রবাদে। লোকগাথায়। এবং অবশ্যই নিষিদ্ধ এক সমপ্রেমে।
দুহাজার চব্বিশে কান চলচ্চিত্র উৎসবে 'আন সার্টেন রিগার্ড' বিভাগে ছবিটি অন্তর্ভূক্তির পর বিশ্ব জুড়ে বেশ আলোচনা হয়েছে। এক তথ্যচিত্র পরিচালক তার কাহিনী চিত্রের জন্য আলোচিত হয়েছেন। সমালোচিতও।
আমাকে অবাক করেছে এই অদম্য ছুটে চলা সময়ে, এই বিভৎস রিলের যুগে (পড়ুন দৃশ্যায়ণের রাজনীতির) পরিচালক মিন কুয়ের ছবির ভাষা যেন ব্রেসঁকে স্মরণ করিয়ে দেন। এক প্রাচীন দৃশ্যপটের অনুধ্যানের রীতি তিনি তাঁর ছবির গড়নের ভাষায় লিপিবদ্ধ করেন। তাঁর ছবিতে নৃতত্ত্বের মতো অনুধ্যায়িত হয় তথ্যচিত্রের আবহ। আর সংলাপ? না সবটা কেন বলবো? ছবিটি সম্প্রতি মুবিতে এসেছে। পারলে দেখে ফেলুন। তারপর না হয় আলোচনা করা যাবে।
এবার পুজোয় ডেস্টিনেশান ভিয়েতনাম হলে হয়তো ফূর্তির কোন ফাঁকে মনে পড়ে যাবে ভিয়েত এর কথা। নামের কথা। তাদের ভালোবাসার কথা। হয়তো কোন কালে মেরুদন্ড সোজা রেখে যুদ্ধ করা এক দেশের কথাও।
ছবি- গুগুল ইমেজের সৌজন্যে





মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন