ডুলুংপারের মেয়েটিকে
ডিসেম্বরের কনকনে ঠান্ডায় এক কবির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল আমার। এই বছরেই। সবাই সব কথা, গান, কবিতা বলে চলে যাওয়ার পরে অনেক রাতে দঙ্গল বেঁধে যখন আমরা শুতে এলাম ঠিক তখনই আর একটা উৎসবের সূচনা হলো যেন। শীতলবাবু যিনি সেই সভার কোনো বক্তা ছিলেন না। শুধু শুনতে এসেছিলেন মানুষ কী বলে? কী ভাবে? কেমন করে লেখে? তাঁর ঝাঁপি যখন খুলে বসলেন তখন জঙ্গলঘেরা এক লাল মেঠো পথ দেখতে পেলাম আমরা। জঙ্গলের মধ্যে একটা স্কুল জ্যান্ত হয়ে উঠলো তক্ষুনি। খাগ জুনিয়র হাইস্কুলের বাচ্চাদের সঙ্গে আমরাও যেন বেরোলাম গাছ চিনতে। যে যত গাছের নাম লিখতে পারবে খাতায় তার তত খুশির জোয়ার ডাকবে মনে। এটাই হলো পুরষ্কার। ভাবা যায়? (খাগ জুনিয়র হাইস্কুলের একটা ফেসবুক পেজ আছে। পারলে তাদের কর্মকান্ড দেখে আসতে পারেন।) আমার অনেক দিন আগেই এইসব খাতা হারিয়ে গেছে। কিম্বা কোনোদিন ছিল না বললেই চলে। তাই আঁজলা ভরে শীতল বাবুর গল্প শুনছিলাম। “ আর সেই যে অন্ধ ভিক্ষু গায়ক। বিষ্ণুপুরের। তার কথা বলুন”। হিমু উসকে দেয় শীতের আগুন। শীতলবাবু পরতে পরতে খোলেন তাঁর গল্পের ঝাঁপি। এইসবের মাঝে একটা ঝাঁকড়া চুলের ছেলে চুপ করে বসেছিল। শুভদীপ বললো, “স্যার উজ্জ্বল কিন্তু কবি। ওর কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। ভালো ঝুমুর গায়”। একজন কবি এবং গায়ককে হাতের কাছে পেলে শীতালু ঝিম ধরা কুয়াশার রাতেও জ্যোৎস্নার প্লাবন বয়। উজ্জ্বলকে সাধাসাধি করতে হলো না। উজ্জ্বল তার কবিতার খাতা খুলে বসলো।
শুশনি শাক বরাবর প্রিয় আমার
এমন বাদলাদিনে
দিদিমা একা
ডুংরিগড়া, করমথান, শেয়ালডাকার মাঠ পেরিয়ে
কুড়িয়ে আনে টোকা ভর্তি শ্রাবণ।
জ্বরের ঘোরে স্পর্শ পাই
দিদিমার জেগে থাকা দীর্ঘ রাত
সাত ভূতের শ্যাওড়াগাছের পাশে আলোকবর্ষ পেরোনো লণ্ঠনের টিমটিম।
বাড়ি থেকে মেসবাড়ির এই দূরত্ত্বটার মাঝে
দাদুর ভাঙা সাইকেল ছুটে বেড়ায়।
রোজ সকালের নিয়ম করা আলুসেদ্ধ ভাতের পাশে
দিদিমা এনে দেয় ফুড়কি ছাতুর বর্ষা।
(জ্বরের দিনে দিদিমাকে/ ডুংরিপাড়ের মেয়েটিকে/ পাতা ১৩)
উজ্জ্বল বড় হয়েছে দিদিমার কাছে। বাড়ির প্রথম প্রজন্ম সে; যে একদিন স্কুলে গিয়েছিল। এখন কল্যানী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার এক শাখায় গবেষণা করছে। পুরুলিয়া, তার মাটি, কুমারী নদী আর দিদিমা উজ্জ্বলের লেখায় বারবার ফিরে আসে। সেদিন অনেক রাতে ঘোর লেগেছিল আমাদের কবিতার। উজ্জ্বলের কবিতার। আমরা নিঝুম হয়ে একটা ঘরের মধ্যে সবাই এক আলোকিত ছেলের গল্প শুনছিলাম। কথা ছিল উজ্জ্বল পাঠাবে তার প্রথম কবিতার বই। ‘ডুলুংপারের মেয়েটিকে’। উৎসর্গ করেছে তার সব কবিতা দিদিমাকে। যিনি একদিন কোলে করে না নিয়ে এলে এমন কবিতা লিখতো কেমন করে সে? এমন মায়া দিয়ে বেঁধে রাখতো কি করে আমাদের? এতো রাতেও তাই উৎসর্গ পত্রের দিকে তাকালে চোখ ছলছল করে।
“হে দশকপূর্বের গ্রাম
কার কাছে দিয়ে যাবে মাড়ুলির উত্তরাধিকার
ব্রতের দূর্বা ঘাস?”
'আসলে অপেক্ষারাই পলাশ হয়ে ফোটে'। বইটির একটি কবিতার নাম। এই অসময়েও কবিতা শীত ধরায়। জ্বর আনে। আসন পেতে গরম ভাত বেড়ে দেয় মাটির হাঁড়ি থেকে। হাঁসেদের চইচই ডাকে সন্ধ্যা নামে। অপার বিস্ময় ঘটায় একটা বই।
এই বইটি খুব যত্ন করে ছেপেছেন বার্ণিক। বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলংকরণ প্রণবশ্রী হাজরা। পাতায় পাতায় এতো সুন্দর স্কেচ। সৃজনের এমন দৃষ্টান্ত মন ভালো করে দেয়। কতজনকে ইতিমধ্যে উজ্জ্বলের কাছ থেকে ধার চেয়ে কবিতা শুনিয়েছি। কতজন যে চুপ করে বসে থেকেছেন।
একটা চৌষট্টি পাতার বই ফিরিয়ে দিতে পারে এক অচেনা, অজানা প্রাণকে। যাকে হয়তো এতোদিন খুঁজে ফিরছিলাম আমরা সবাই।
ভালো থেকো উজ্জ্বল। তোমার আরও অনেক কবিতা শোনার আশায়।
ডুলুংপারের মেয়েটিকে
উজ্জ্বল গরাই।
প্রচ্ছদ ও অলংকরণ- প্রণবশ্রী হাজরা।
প্রকাশক বার্ণিক।
বিনিময় মূল্য- ১৫০ টাকা।





মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন