মোট পৃষ্ঠাদর্শন

বুধবার, ১১ জুলাই, ২০১৮

ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি


অনেক সকালে ঘুম থেকে আমাকে তুলে দিল আমার ভাইঝি শ্রী। কাকা দেখো “ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি”। একটু অবাক হই। জানিস তুই, কাকে বলে ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি? ক্লাস এইটে পড়া শ্রী তার নাকের ডগায় চশমা এনে বলে “যে বৃষ্টিতে ইলিশ মাছের গন্ধ বুঝলে? যাও বাজারে যাও। আজ ইলিশ মাছ আনবে কিন্তু।” বাইরের আকাশ আমার ঘর থেকে এখন আর দেখা যায় না। চারপাশে উঁচু উঁচু এ্যাপার্টমেন্ট। তবু চারদিকের বাড়ির গা বেয়ে ঝুরো ঝুরো জলকণা। কবে কারা যেন গঙ্গায় মাছ ধরতে যেত? কবে যেন ঘনি শিখিয়েছিল বৈঠা টানা? মাছের জাল বুনতে বুনতে কত গল্প করতো দয়ারামের দাদু। আমি হাঁটি ছাতা না নিয়ে বাজারের ব্যাগ হাতে স্মৃতির স্মরণীতে। গল্প গুলো মুখিয়ে থাকে কি-প্যাডে টাইপ হবার বাসনায়।

এই শতকের গোড়ার দিকের ঘটনা। তখন সবেমাত্র জঙ্গল মহলের শাল, মহুয়া, পলাশ, কেন্দু ঘেরা জঙ্গলে বারুদের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। জঙ্গলবর্তী গ্রাম গুলো তাদের পাওয়া আর না পাওয়ার হিসেব চাইতে শুরু করেছে। মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে নিজেদের ভাষায় আন্দোলন করার তাগিদ। দীর্ঘ দিনের দারিদ্র্য, জমা রাগ, কষ্ট জমাট বাঁধছে মহুয়া ফুলে। পলাশের রাঙা হয়ে যাওয়া বিস্তৃর্ণ অঞ্চলে। ঠিক এমন সময়ে যখন ক্যামেরা নিয়ে ঘুরছি আমরা, শুনছি মানুষের কথা। গ্রামের কথা। একটা ছোট্ট স্কুলের মিড-ডে মিল রান্না করা দিদির কথা। তখন আমার সাথে পরিচয় হয়েছিল শিবুর। পরুলিয়ার জঙ্গলবর্তী একটা ছোট্ট বাজারের কাছে ছিল তার চায়ের দোকান। বর্ষাকাল। কাজেই সবসময় ঝুপঝুপে বৃষ্টি আর অবিরাম চা খাচ্ছিলাম আমরা। বৃষ্টি কখন থামবে তাই নিয়ে চলছিল আলোচনা। শিবু চায়ের গ্লাস আমাদের দিকে বাড়িয়ে একবার তাকিয়ে নিল ঘন কালো মেঘের দলের দিকে। তারপর বললো “শোনো বাবু, দশ মিনিটের মধ্যে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যাবে...। তখন ক্যামেরা নিয়ে ফটোক তুলো বটে”। আমরা পাত্তা দিইনি। কিন্তু ঠিক তার দশ মিনিটের মধ্যে যখন বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেল আমরা অবাক চোখে তাকিয়ে দেখেছিলাম শিবুর দিকে। আমাদের ভালোবাসা বেড়ে গিয়েছিল। আর ঘন ঘন চায়ের দোকানে আসাও। যেদিন চলে আসবো তার আগের দিন শিবু নেমনতন্ন করলো তার দোকানে ভাত খাওয়ার। এমনিতে চা বিক্রি করে শিবু। অন্য কিছু না। কিন্তু আদর করে যদি কেউ ভাত খেতে বলে অনেক দিন বাড়ি ছাড়া আর ঘর ছাড়া ছেলেদের তখন কার না আনন্দ হয়? দেশী মুরগীর ঝোল আর ভাত। কিন্তু তার আগে গরম ভাতের পাশে শিবু পোস্ত বাটার মতো কি একটা দিলো। আমি জানতে চাইলাম, এটা কী শিবু? শিবু মিট মিট করে হেসে বললো “খেয়ে দেখেন কিনা বটে”। থলথলে মাখাটা যখন একটু মুখে দিলাম তখন একটু টক, ঝাল আর বুনো গন্ধের মিশ্রণ আমাকে মনে করিয়ে দিল বিশাল অরণ্যে যাদের জন্য ছবি বানাতে এসেছি তাদের কথা। মনে করিয়ে দিল গাছে ঝুলে থাকা থোকা থোকা পিপড়ের বাসা গুলোকে। শহরের মন বললো পড়নি কল্লোল গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যকে? আমি লাল পিঁপড়ে বাটা দিয়ে অনেকটা লালচে মুড়ির চালের ভাত মেখে নিলাম। হাপুস হুপুস শব্দ তুলে যখন খাচ্ছি তখন হঠাৎ মনে পড়ে গেল আমাদের বালীর গঙ্গার ধারে রাসবাড়ির বড় ফুটবল খেলার মাঠটার কথা। আশির দশকের শুরুর দিকে সেখানেও তখন আকাশ ভর্তি জল ভরা কালো মেঘ। ঘনি মাথা তুলে আকাশ দেখে বললো বাড়ি যা টুকনু। বৃষ্টি এলো বলে। কাশীপুরের বন্দুক তৈরী কারখানার ওপরে যে মেঘটা ছিল নিমেষে ভিজিয়ে দিলো এপারে থাকা আমাদের।
এই বন্দুক তৈরীর কারখানাটা গঙ্গার পাড়ে থাকা আমাদের বিস্ময়ের সৃষ্টি করতো। এপার থেকে যখন ওপারের ওই বিরাট কারখানাটা দেখতাম তখন মনে মনে অনেক কিছু কল্পনা করে নিতাম। ঠুলি গঙ্গায় পয়সা কুড়োতে কুড়োতে বলতো ওই কারখানার নীচে আছে নাকি অনেক সুড়ঙ্গ পথ। আর সেই পথের মধ্যে বড় বড় বন্দুক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গুঁফো সৈনিক। অনেকক্ষণ ধরে সাঁতার কেটে মা গঙ্গার বুকে উলটো ডাইভ দেওয়া আমার চোখ তখন লাল। জানতে চাই কী করে জানলি তুই? ঠুলি জানালো ও যখন অনেক রাতে ঘনির নৌকা করে ইলিশ মাছ ধরতে গিয়েছিল তখন দেখে ফেলেছে। জোয়ারের টানে নৌকা কাচের মন্দির ছাড়িয়ে, অনেক অনেক দূরে যখন চলে যাচ্ছে। ইলিশের ঝাক যখন ছুটে আসছে লঞ্চের মতো তখন ওরা বুঝতেই পারেনি কখন এসে গেছে সেই বড় কারখানাটার সুড়ঙ্গ পথে। সৈনিকরা উচু করে ধরে আছে বন্দুক। ভাগ্যিস জলে জালের মধ্যে থাকা ইলিশ গুলো একসাথে আবার সাঁতার কাটতে শুরু করলো, তারাই বের করে আনলো নৌকাকে সুড়ঙ্গ থেকে। হাঁ করে শুনি ঠুলির গল্প। বিশ্বাস হয়ে যায়। ও অনেক কিছু জানে। মা গঙ্গাকে চেনে এপাড়ার অনেকের থেকে বেশী। তুচ্ছ তাচ্ছিল্য মোটেই করিনা আমি।

কিন্তু কথা বেশী এগোয় না। ঘাটের সিড়ির কাছে চলে এসছে দাদা। আমি যে বাড়িতে অনেকক্ষণ নেই খেয়াল হয়েছে মায়ের। তলব এসেছে তাই। কিন্তু এদিকে যে কার্তিকদা জুলে ডুব দিয়ে খালি হাতে মাছ ধরছে। সেটাও না দেখে যাই কী করে? আচ্ছা, তুমি কোনদিন দেখোনি বুঝি এক ডুবে খালি হাতে মাছ ধরে নিয়ে আসা? আচ্ছা বেশ তাহলে শোনাই সে গল্প আগে তারপরে অন্য কিছু। কার্তিকদা গঙ্গায় চান করতে এলে মাছ না নিয়ে বাড়ি ফিরতো না। এক ডুবে অনেকক্ষণ জলের নীচে থেকে কার্তিকদা ধরে নিয়ে আসতো হাতে করে কখনও আড় মাছ। কখনও বা বড় চিংড়ি। কখনও ট্যাংড়া। জলের মধ্যে মাছেদের গতিবিধি জানা থাকতো কার্তিকদার। ঘাটের কাছে কোথায় কোন বড় গর্ত, কোথায় কোন সুড়ঙ্গে মাছ লুকিয়ে আছে এগুলো ছিল তার কাছে চেনা ম্যাপের মতো। বলতে পারো এদের সাথে থাকতে থাকতে আমার জলের ভীতি কমে গেছে। সে গল্প অন্যদিন শোনাবো। 

কার্তিকদাদের একটা বড় নৌকা আছে। সেই নৌকা করে কার্তিকদারা মাছ ধরতে যায়। সারা রাত মাছ ধরে। বালী ব্রিজের তলায়। কাশীপুরের ফ্যাক্টরির কাছে। কুমোরটুলী পর্যন্ত। সারা রাত মাছ ধরে সকালে ফিরে আসে ঘুম চোখ নিয়ে। জাল ভর্তি কুচো চিংড়ি, ফ্যাসা, ছোট ভোলা, বেলে মাছ কচু পাতায় ভাগ ভাগ করে বিক্রি করে কার্তিকদার ঠাকুমা। আমার বাবা সেখান থেকে মাছ কিনলে আমার মন ভালো হয়ে যায়। দাদা আরও খান দশেক অঙ্ক বেশী করে। কন্টিদের যে হুলোটা আমাদের বাড়িতে রোজ ভাত খায় সে গলা ফুলিয়ে একটু বেশী আদুরে গড়গড় করে। আর দাদার পাশে বসে চোখ বন্ধ করে মাঝে মাঝেই বাতাসে নাক তুলে শোঁকে আর আস্তে আস্তে ম্যাও ম্যাও করে ডাকে। তখন ওদিকে মা কয়লার উনুনে বসিয়ে দিয়েছে কুচো মাছের ঝাল। হালকা সর্ষে বাটা কাঁচা লঙ্কা চিরে। সারা বাড়িতে ছড়িয়ে পড়েছে এক আবেশ করা গন্ধ। আমিও চুপি চুপি হুলোর কানে গিয়ে বলি শুনবি আজকে আমাদের মেনু? কুচো চিংড়ি ভাজা শুড় সমেত (এতো ছোট চিংড়ির শুড় মা বাছতে পারতো না। খেতে গেলে মুখে একটু আধটু লাগতো। কিন্তু তাতে মজাই পেতাম আমরা)। মুশুড়ির ডাল। কাঁচা লঙ্কা আর হলুদ দিয়ে ছোট চিংড়ির ট্যামটেমে ঝোল আর চুনো মাছের ঝাল। হুলো বেজায় খুশি হতো। গলা তুলে আরও দুবার মিয়াও মিয়াও করতো। এখন আমরা যে অঞ্চলটায় থাকি সেখানে মা গঙ্গার সন্তানদের সংখ্যা অনেক নয়, বিপুল ভাবে কমে গেছে। কারণ হাওড়া থেকে শুরু করে হুগলী সারা শহরের অশোধিত জল এসে পড়ছে আমাদের মা গঙ্গার বুকে। তাঁর সারা গায়ে ক্ষতের চিহ্ন। আমাদের থালা গুলো আজ চুনো মাছের ঝাল হীন। যখন এমন দুঃখ দুঃখ গন্ধ লাগতে শুরু করেছে লেখার গায়ে তখন মনে পড়লো আরেক জায়গার কথা।

ঢাকাতে নিউ মার্কেটে যেতে হয়েছিল প্রথম সফরেই। আমার বন্ধু দেবালয়ের শ্বশুরবাড়ির সব আত্মীয়স্বজন চট্টগ্রামের লোক ছিলেন। তারা পই পই করে তাকে বলে দিয়েছে নোনা ইলিশ আনতেই হবে। আমি আর সে এই নতুন দেশে প্রথম। যদিও আমরা হিসেব করে দেখলাম দেবালয় ফিরছে তার দেশে প্রায় সত্তর বছর পর। আমি প্রায় ষাট বছর পরে, পিতৃ-পিতামহদের হিসেব মিলিয়ে। এই দেশের যে জাগতিক গল্প তখনও আমার কানে বাজে সেতো খুলনার কোন এক অখ্যাত গ্রাম কলাপোতার। ঢাকা তো নয়। তাহলে এই প্রথম আসা মণি ঠাম্মা বড়মার দেশে নোনা ইলিশ কোথায় পাবো? এতো অল্প সময়ের মধ্যে আসা সফরে এতো কিছু করা যায় নাকি? এখনও তো গুড়ের চা খাওয়া হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় চত্ত্বরে মধুর ক্যান্টিনের ছোট রসগোল্লা। ময়মনসিংহের মন্ডা। বগুড়ার দই। কত কিছু। তার মধ্যে কিনা নোনা ইলিশ? আমাদের মুশকিল আসান করলেন কবি পারভেজ চৌধুরী। “চলেন আপনাদের নিয়ে যাই নোনা ইলিশের স্বর্গে”। এমনিতে তুমি ঢাকাতে বছরের যে সময়েই যাও না কেন ইলিশ তোমার পাতে অপেক্ষা করবেই। প্রমান সাইজের ইলিশ খেতে খেতে যখন তুমি বড়ই স্মৃতি-মেদুর তখন তোমাকে একটু ঘুরে আসতেই হবে ইলিশের বাজারে। নয়তো আমার মতো নোনা ইলিশের ঠিকানায়। 

না মানে আমি কি আপনাকে বোঝাতে পারছি এটা আমরা নিয়ে যাবো উড়ো জাহাজে করে। বুঝতেই পারছেন তার আগে আছে আন্তর্জাতিক পুছতাছ। চেকিং। নানা রকমের দরজা পেরোনো। এবং সবশেষে প্লেনে উঠে বসা। অনেক রাতে কলকাতায় নেমেও শান্তি নেই। নিজের দেশেও চোখের মণি মেশিনে ঠেকিয়ে প্রমান দেওয়া আমি তোমাদেরই লোক। অনেকক্ষণ আমার লেকচার শুনলেন শ্বেত শুভ্র দাড়ি শোভিত বেশ বয়স্ক এক চাচা। নিউ মার্কেটে তাঁর দোকান ইতিহাসের অনেক সাক্ষী বহন করে। আমার আর দেবালয়ের সামনে প্রায় আড়াই কিলোর নোনা ইলিশ তুলে ধরে বললেন “আপনারা তো আর প্রথম নন। ভারত থেকে যারাই আসেন... নিয়ে যান আমার কাছ থেকে। এমন করে প্যাক করে, সিল করে, রসিদ দিয়ে দেবো চিন্তার নেই কিছু।” আমার সামনে যখন একটা আস্ত তিমির মতো ইলিশ প্যাক করছেন চাচা। দেবালয় পান খাওয়া মুখে মিটিমিটি হাসছে আমি তখন ছুটছি এক বিশাল লম্বা দৌড়ে ছোট্টবেলার ফ্ল্যাশ-ব্যাকে। গঙ্গার ধারে গোরা কাকুর বাড়িতে আমার রাঙা দিদা রান্না ঘরের কড়িকাঠ থেকে অনেক দিন পরে নামিয়েছে নোনা ইলিশের হাড়ি। আমি আর দাদা ঝুকে আছি হাড়ির দিকে। রাঙা যত্ন করে বের করে আনছে গেল বছরের নোনা ইলিশ। আর পুরে দিচ্ছে এই বছরের টাটকা ইলিশের টুকরো গুলোকে। অতি যত্নে তার ওপর বিছিয়ে দিচ্ছে নুনের হালকা প্রলেপ। এই হাড়ির গল্প আমাদের এ-বাড়ি ও বাড়িতে ঘুরে ঘুরে বেড়াতো। পাড়ার যারা নোনা ইলিশের ভক্ত তারা মাঝে মধ্যে চেয়ে চিনতে নিয়ে যেতো। নতুন জামাই এলে তার জন্য বাটি ভর্তি তুলে রাখা হতো নোনা ইলিশের চচ্চড়ি। সারা বাড়ি গন্ধে ম ম করলে চাড্ডি ভাত খাওয়া বেড়ে যেত সবার। 

আমার ঠাম্মার আবার নোনা ইলিশে গন্ধ লাগতো। নবদ্বীপের মেয়ে। বাঙাল বাড়ির রান্না-বান্নার সাথে কোথাও মিশিয়ে দিয়েছিল ঘটি বাড়ির আদব কায়দা। ইলিশের তেলে ইলিশ ভেজে। কালো জিরে ফোড়ন দিয়ে। হালকা জল ছড়িয়ে দিতো কড়াইয়ে। একটু হলুদ, গোটা চারেক কাঁচা লঙ্কার মাঝে সাঁতার কেটে বেড়াতো ঘনির জালে ধরা পড়া ভোর বেলার ইলিশ গুলো। আমি আর দাদা তখন উদ্বাস্তু শিবিরের মতো চুপ করে বসে থাকতাম রান্না ঘরের দোড়টায় থালা নিয়ে। ঠাম্মা খুলনার কোলাপোতার গল্প বলতো। লাউ দিয়ে চিংড়ি মাছ। কচুর শাকে ইলিশের মাথা। মোচার ঘন্ট। ডুমুরের ডালনা। কেওড়া ফলের চাটনি। পাশে বসে কন্টিদের হুলোটা ল্যাজ নেড়ে যেত সমানে। ওকি বুঝতো কে জানে? উঠোনে তখন ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি।

ভূমধ্যসাগর, জুন, ২০১৮, সংখ্যায় লেখাটি প্রকাশিত।