মোট পৃষ্ঠাদর্শন

শুক্রবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৩



ছ্যাঁচড়া
কোন এক বর্ষার সকালে জন্ম হয়েছিল ইন্দুবালার। কোন এক মাঘের কুয়াশা ভরা ধান ক্ষেতের আল দিয়ে হেঁটে বাবার হাত ধরে স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। শুধু এইটুক মনে আছে ফুল ফুল ছাপ একটা ফ্রক পড়েছিলেন। গায়ে ছিল মায়ের বোনা সোয়েটার। মাথায় উলের টুপি। ঠাম্মার কাছে শোনা রূপকথার রানী বলে মনে হচ্ছিল সেদিন নিজেকে। ঠাকুরদার টোলটা তখনও চলছে টিম টিম করে। সেই টোলে বর্ণপরিচয়, ধারাপাত এইসব টুকটাক শিখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু বেশি দিন সেখানে পড়া হলো না। আমের গাছে মুকুল ভরিয়ে, সরস্বতী পুজোয় হাতে খড়ি দিয়ে দাদুর বড্ড তাড়াতাড়ি ছিল হয়তো এক্কেবারে চলে যাওয়ার। শিশিরে ভিজেছিল টোলের রাস্তাটা। সেদিন কেউ আর দাওয়া ঝাঁট দেয়নি। উঠোন ল্যাপেনি। পাশের মুকুল ভর্তি বুড়ো আমগাছটা কাটা হয়েছিল সৎকারের জন্য। ঠিক এর পরেই দুটো গাঁ পেরিয়ে পড়তে গিয়েছিলেন ছোট্ট ইন্দুবালা। পড়াশুনোয় তাঁর বেজায় মন ছিল। দাদু স্বপ্ন দেখিয়ে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। ওই টুকুনি মেয়ে অতো কিছু বুঝতো না। শুধু অনেক দূরে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকতো। এক্কা-দোক্কা, লুকোচুরি, খেলনা বাটির বয়েস পার করে ইন্দুবালা প্রবেশ করলেন এবার হাইস্কুলে।  সেখান মেয়ে বলতে হাতে গোনা ওই কজন। মাঝের পাড়া, পূবের গাঁ আর কোলাপোতা মিলিয়ে মেয়ের সংখ্যা তেমন একটা ছিল না। থাকবেই বা কি করে? সবাইকে স্কুলে যাওয়ার অনুমতি দিতো না বাড়ির লোকজন। ছেলের পালের মধ্যে মেয়ে বসুক শুনেই হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসতো অনেকের বাড়ির লোকের। ইন্দুবালার মা’র পছন্দ ছিল না স্কুলটা। কোনদিন। বাড়িতেই তো পড়াশুনো করা যায়। অনেক বার সে কথা বলেছেন স্বামী ব্রজমোহনকে। কিন্তু যার বাবার টোল ছিল। যে নিজে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক কালে পড়াশুনো করেছে। কিন্তু ভাগ্যের ফেরে মাঝপথে ছেড়ে দিয়ে এসে সংসারে হাত লাগিয়েছে সে তার মেয়েকে পড়াবে না তা হতে পারে? মায়ের খানিকটা চিল চিৎকারেই হোক, আর চারপাশের পরিস্থিতি দ্রুত পালটে যাওয়ার কারণেই হোক কোন এক সূত্র ধরে বাবা চিঠি লিখেছিলেন তাঁর বনগ্রামের এক বন্ধুকে। “মেয়ের বিবাহ তাড়াতাড়ি সম্পন্ন করতে চাই। ভালো পাত্র থাকলে জানিও।” সেখান থেকে উত্তর পেতে দেরী হয়নি। ছেলে একেবারে ‘মাষ্টার’। নিজেদের দোতলা বাড়ি। বনেদী বংশ। বন্ধুর বিশেষ পরিচিত। শুধু একটু খুঁত আছে। খুঁত? ঠাম্মা সেদিন বাড়িতে তালের ভাপা পিঠে করেছিলেন। অষ্টম প্রহরের জন্য বাড়িতে ছিল নিরামিষ রান্না। হাড়িতে সেদিন বসেছিল আতপ চালের খিচুরী। আলু গুলো ডুমো ডুমো করে কাটা ছিল। বাগান থেকে ইন্দুবালা তুলে এনেছিলেন অসময়ের কাঁচা টমেটো। নামানোর আগে ঠাম্মা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন হরিমতির দুধে তোলা বাড়ির ঘি। কলাপাতায় খেতে বসে ‘দোজবরে’ শব্দটা জীবনে প্রথম শুনেছিলেন ইন্দুবালা। ছাদনা তলায় ছেলেকে দেখে ডাকাত মনে হয়েছিল। ইয়া গোঁফ, বাবড়ি চুল। চোখ লাল টকটকে। দাঁত গুলো খয়েরের ছোপে মলিন। ছেলে বরণ করে এসে এই প্রথম মা, বাবার হাত ধরে জানতে চেয়েছিলেন “সব খবর নিয়ে দিচ্ছো তো মেয়েকে? মুখ দিয়ে যে গন্ধ বেরোয়। সবাই ফিস-ফিসাচ্ছে। বলছে মাতাল বর।” কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। বাসর ঘরে কড়ি খেলা শুরু হয়ে গেছে। একটু পরেই বউয়ের পাশে নতুন স্বামী ঘুমে ঢলে পড়লে ইন্দুবালা ভালো করে তাকিয়েছিলেন লোকটার মুখের দিকে। হাঁ করে ঘুমোচ্ছিলেন বাবু মাষ্টার মানিক রতন মল্লিক। নাক ডাকার চোটে বাইরে এসে বসেছিলেন ইন্দুবালা। সেই শেষবারের মতো জোনাকি গুলো যখন আলো জ্বালিয়ে তাঁকে ঘিরে ধরলো তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারেননি। কেঁদে ফেলেছিলেন। একটা মেয়ে তার যাবতীয় শেষ স্বপ্নটুকু নিয়ে কাঁদছে। তার সাক্ষী কোন কাছের মানুষ ছিল না সেদিন। কোনদিনই অবশ্য থাকেনি ইন্দুবালার পাশে কেউ। কিন্তু জামগাছটা ছিল। তুলসীতলা তলা ছিল। পুকুর পাড়ের কাঁচা মিঠে আমগাছটা যেন ডালপালা নেড়ে বলেছিল “কাঁদিস না ইন্দুবালা। এটা তোর নিয়তি।” 

মেয়ের হাত থেকে কণকাঞ্জলি নিয়ে মা আর ফিরে তাকাননি। এক রাতের মধ্যেই তিনি বুঝে ছিলেন কার হাতে মেয়েকে তুলে দিলেন শেষ পর্যন্ত। নিজের স্বামীকে বেশি কিছু বলতে পারেননি। এমনকি দায় চাপাতেও না। কারণ তিনি জানতেন তাঁর মেয়ে দিন-দিন একটা আগুনের গোলা তৈরী হচ্ছে। ওই রূপ এই পাড়া গাঁয়ে, খাল বিল পুকুরের পাশে, শাপলা গন্ধরাজের মতো যত ফুটে বেরোবে তত বাড়ির বিপত্তি বাড়বে। এমনিতেই রাত বিরেতে ঘুম ভেঙে যায় তাঁর। এগিয়ে গিয়ে দেখেন দরজার হুড়কো ভালো করে দেওয়া আছে কিনা। বাড়িতে আগুন রাখলে তার সাথে যে পর্যাপ্ত জলও রাখতে হয় সেটা মনে করেই হাত পা সিঁধিয়ে যেত তাঁর। পাশের গ্রাম থেকে মনিরুল মাঝে মাঝেই আসতো ইন্দুবালার কাছে পড়া দেখতে। এক্কেবারে পছন্দ হতো না তাঁর মার। ইন্দুবালা সেটা বুঝতেন। কিন্তু মনিরুলকে খুব মিষ্টি লাগতো। গুটি আমে সরষের তেল কাঁচা লঙ্কা চিনি মাখিয়ে খেলে যেমন মনিরুল ঠিক তেমন। লজ্জায় মুখ লাল হয়ে যায় ইন্দুবালার। এইসব কি ভাবছেন তিনি? তড়িঘড়ি বাইরের দাওয়ায় আসন পেতে, কাঁসার গ্লাসে জল দিয়ে বসতে দিতেন মনিরুলকে। এই বাড়িতে ছোঁওয়া ছুঁয়ির বাধ বিচার তেমন না থাকলেও মনিরুলের জায়গা কোনদিন বাড়ির অন্দরে হয়নি। হতোও না কোন কালে। যদিও ধর্ম-জাত এইসব নিয়ে বড় একটা মাথা ঘামাতেন না দাদু। কিন্তু বাবা মা ছিলেন উলটো পথের পথিক। ছুত মার্গের বাছ বিচার যে কত দূর যেতে পারে তা দেখেছিলেন কলকাতায় এসে। শাশুড়ির সাংসারে। তার জীবন থেকে সবাই চলে যাবার পর ইন্দুবালা এইসব এঁটো কাটা পরিষ্কার করেছিলেন দু-হাত দিয়ে। তাঁর কাছে মানুষ মানে ছিল জীব। তিনি পেট ভরে ভাত খাইয়ে জীবে প্রেম করতেন। 

মনিরুলের তখন সদ্য গোঁফ উঠেছে। কেষ্ট ঠাকুরের মতো বাঁশি বাজায়। চোখ গোল গোল করে বাতাবি লেবু গাছের তলায় চন্দ্রবোড়ার বাসার গল্প করে। শুধু তাই নয় সুর করে মাঝে মাঝে কবিতাও বলে,

“আজো এই গাঁও অঝোরে চাহিয়া ওই গাঁওটির পানে
নীরবে বসিয়া কোন কথা যেন কহিতেছে কানে কানে।
মধ্যে অথই শুনো মাঠখানি ফাটলে ফাটলে ফাটি,
ফাগুনের রোদে শুকাইছে যেন কি ব্যাথারে মূক মাটি।
নিঠুর চাষীরা বুক হতে তার ধানের বসনখানি
কোন সে বিরল পল্লীর ঘরে নিয়ে গেছে হায় টানি।”
 
‘নক্সী কাঁথার মাঠ’-এ সাজু আর রুপাইয়ের করুণ পরিণতি বারবার যেন শুনতে চান ইন্দুবালা মনিরুলের কন্ঠে। জসীমউদ্দিন যে তাঁর বড় ভালো লাগা কবি। চোখ ভিজে আসে তাঁর সাজু আর রূপাইয়ের দুঃখে। ঝি ঝি ডেকে ওঠে। ঠাম্মা চুপ করে সলতে পাকান। ভাইগুলো কবিতা শুনতে শুনতে হাঁ করে বসে থাকে সবে সন্ধ্যে নামা কোলাপোতার দাওয়ায়। দূরে আজানের শব্দ ভেসে আসে পাশের বাড়ির সন্ধ্যের শাঁখে। চেয়ে থাকেন ইন্দুবালা মনিরুলের দিকে। কবেকার মনিরুল তার সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে সহজ সরল টানা টানা চোখে তাকায়। আর এদিকের সত্তর ছুঁই ইন্দুবালা যেন একটুও নড়তে পারেন না বিছানা থেকে। চুপ করে শুয়ে থাকেন। উনি জানেন এই ঘোরটুকু নিয়েই এখনও বেঁচে আছেন। যেদিন এই ঘোর কেটে যাবে সেদিন তিনিও চিরকালের মতো ছেনু মিত্তির লেন ছেড়ে কোথায় কোন দূরের পথে পা বাড়াবেন। ধনঞ্জয় নীচ থেকে ডাকছে। তাকে বাজারের টাকা দিতে হবে। ফর্দ করতে হবে। কিন্তু আজ তাঁর যেন কিছুই শুনতে ইচ্ছে করছে না। কাজ করতে ইচ্ছে করছে না। বর্ষার বেলা গড়াচ্ছে তিনি চুপটি করে শুয়ে আছেন। কারণ ওদিকে মা সেই সন্ধ্যে হয়ে আসা ভালোবাসার পরিবেশে শুধু শুধু তাড়া লাগাচ্ছেন। মা বুঝতে পারছেন লক্ষণ ভালো না। আগুনের গোলা হয়ে উঠছে মেয়ে। সবার চোখ তার দিকে। এমনকি এই এক রত্তি ছেলেটারও। শেষকালে কিনা মেয়ে বিধর্মী হবে? বাড়ি থেকে পালাবে? কিম্বা পাশের গ্রামের স্বর্ণলতার মতো দেহটা ভেসে উঠবে পুকুরে? ছেলেটাকেও তো ছাড়েনি বাড়ির লোকেরা। ধান ক্ষেতে কুপিয়ে রেখে দিয়েছিল। ভাবতে পারেন না আর। মুখ দিয়ে বেড়িয়েই যায় “এবার তুই উঠে পড় মনিরুল। অনেকটা পথ যাবি। মায়েরও তো চিন্তা হয় তাই না?” কথা গুলো বলতে পেরে যেন শান্তি পান ইন্দুবালার মা। মনিরুল গুছিয়ে নেয় তার বই। ব্যাগ। হাতের বাঁশি। লন্ঠন নিয়ে উঠোনটা পার করে দিয়ে আসেন ইন্দুবালা। দাঁড়িয়ে থাকেন বেড়ার দরজায়। যতক্ষণ না মনিরুল সামনের আলটা পেরিয়ে অন্ধকারে মিশে যায়। মনে মনে ভালোবেসে ফেলেছিলেন কি মনিরুলকে ইন্দুবালা? বেসেছিলেনই তো। না হলে কে লুকিয়ে লুকিয়ে মনিরুলের জন্য নাড়ু নিয়ে যেত? মুড়ির মোওয়া। আমসত্ত্ব। গপ গপ করে ছেলেটা খেত। আর এক টানা গল্প করে যেতো। কত যে গল্প ছিল মনিরুলের ওই ছেড়া কাপড়ের ব্যাগে ঠাহর করতে পারতেন না ইন্দুবালা। তাহলে কেন কোনদিন মনিরুলকে নিজের ভালোলাগা, ভালোবাসার কথা বলতে পারেননি? ভয় করেছিল তাঁর? নাকি বড় অভিমান করেছিলেন মনিরুলের ওপরে? মা আসতে বারণ করলেই কেউ আর বাড়িতে আসবে না? স্কুলে কথা বলবে না? পড়াই ছেড়ে দেবে তারজন্যে? এতোটাও কেন ভালোবাসতো মনিরুল তাকে? যে ভালোবাসার দাম দিতে গিয়ে হারিয়ে যেতে হয়েছিল। অনেকদিন পরে ইন্দুবালা ভাতের হোটেলের সামনে যে ছেলেটা চশমা পরে দাঁড়িয়েছিল সে তখন আত্মগোপন করে আছে কলকাতায়। স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে একটা বড় দায়িত্ত্ব নিয়ে এসেছে সে। বালীগঞ্জের কোথাও ওরা একটা রেডিও স্টেশন খুলছে। স্বাধীন বাংলাদেশের বেতার। অনেক দিন পরে রেডিওতে বাঁশির সুর শুনে চিনতে পেরেছিলেন ইন্দুবালা। মনিরুলকে ভোলা যায় না। মনিরুল ভুলে যায়নি। কিন্তু মনিরুল সত্যি হারিয়ে গিয়েছিল একদিন চিরকালের মতো। সেতো একটা ভূবন কাঁপানো গল্প। সেদিকে এখন প্রবেশ করলে ইন্দুবালার প্রথম জীবন অধরা থেকে যাবে। সংসারটা আর যে করা হয়ে উঠবে না।

সেই যে এক ভরা বর্ষায় বিয়ে হয়ে ছেনু মিত্তির লেনের স্যাঁতসেঁতে বাড়িটায় ঢুকলেন তারপর তো আর কোথাও যাওয়া হয়নি তাঁর। একটিবারের জন্যেও না। বাপের বাড়ি যাওয়া কঠিন ছিল। খরচ ছিল, ভিসার ব্যাপার ছিল। এক এক করে সব গয়না বিক্রি করে সংসার চালাতে গিয়ে নিজের দেহকে খালি করে ফেলেছিলেন ইন্দুবালা। মায়ের সামনে দাঁড়ালে তক্ষুনি বুঝে যাবে যে। তাই বিয়ের পর একমাত্র গঙ্গাস্নান ছাড়া আর কোথাও যাননি ইন্দুবালা। সেই যে এসে মল্লিক বাড়ির রান্নাঘরে ঢুকেছিলেন আজও আছেন। কিন্তু তারজন্য কোন ক্ষেদ নেই। ভালোই আছেন। বিয়ের পরে নতুন বউকে স্বামীর বাড়িতে এসে প্রথম দিনই দেখতে হয় রান্নাঘর ভরা আছে তোলা তোলা খাবারে। ডেকচি ভরা ডাল। কড়া ভরা মাছ। হাঁড়ি ভরা ভাত। দই, মিষ্টি। পেতলের পাত্র থেকে উথলে ওঠা দুধ। চারিদিকে ভরা ভরা সব কিছু। ভরা দেখলেই তবে না গেরস্থের সংসার সব ভরে উঠবে। কোলে –কাঁখে মা ষষ্ঠী কৃপা করবেন বছরের পর বছর। “শ্বশুর বাড়িতে প্রথমে রান্নাঘরে গিয়েই হ্যাংলার মতো চোখ বড় বড় করে সব কিছু দেখো না।” পাখি পড়ানোর মতো শিখিয়ে দিয়েছিলেন মা। “যা লোভী মেয়ে একটা। হয়তো দেখা গেল রান্নাঘরে ঢুকেই শুক্তোর পাত্র নিয়ে বসে গেল। পাঁচ ভাজা থেকে নারকেল গুলো তুলে তুলে খেতে শুরু করলো। আনারসের চাটনি আর কারো জন্যে একটুও রইলো না। তখন কি বেইজ্জতিটাই না হতে হবে কুটুম বাড়িতে”। ছোট ভাই পাশ থেকে বলে “আর রসগোল্লা মা? কলকাতার ইয়া বড় বড়। সেগুলো দিদিভাই খাবে না? কিরে খাবি না?” বিরক্ত হয়ে উঠে গিয়েছিলেন ইন্দুবালা। বয়ে গেছে তাঁর একটা অপরিচিত বাড়িতে গিয়ে শুক্তোর হাড়ি নিয়ে বসতে। নারকেল ভাজা খেতে। “কত যে আনারসের চাটনি করো? ওই তো গাছেই পচছে ফল গুলো। বয়ে গেছে... বয়ে গেছে... বয়ে গেছে”। খাবেন না ইন্দুবালা কিছু। সামনে এসে বাবা, বাছা করলেও নয়। তখন অবশ্য বুঝতে পারেননি এতোসব কিছু ইন্দুবালার কপালে জুটবে না কোনদিন। প্রথম বউ মারা যাবার ছয় মাসের মধ্যে বিয়ে হচ্ছে বলে সব কিছু লুকিয়ে রেখেছিল শ্বশুর বাড়ি। এমনকি বিয়েটাও। হঠাৎ হয়ে গেলে যেমনটা হয় ঠিক তেমনটা। অথচ এইভাবে কোলাপোতায় বিয়ে হয়নি ইন্দুবালার। রীতিমতো জাঁক করে তিন গ্রামের মানুষ খাইয়ে নিজের মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন ব্রজমোহন। ঠাম্মা সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। “বরযাত্রী বলতে বরের সাথে মোটে চারটে মানুষ এসেছে? পুরোহিত, নাপিত আর বরের দুই বন্ধু? ব্যাস?” বাবা বলেছিল বুঝতে পারছো না কেন মা পাসপোর্ট ভিসার খরচ নেই? ওদিকেও তো ওদের অনুষ্ঠান আছে না কি?” কিন্তু এদিকে সত্যিই কোন অনুষ্ঠান ছিল না। কোন লোকজন আসেনি। সানাই বাজেনি। একটা ন্যাড়া বাড়ি দেখে বাবার শুধু চোখ উজিয়ে জল এসেছিল। ইন্দুবালার ভাইয়ের হাত ধরে তক্ষুনি চলে গিয়েছিলেন। মেয়ের মুখের দিকেও তাকাতে পারেননি। হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন কি মারাত্মক ভুলটা সত্যি তিনি করে ফেলেছেন। ইন্দুবালারও তখন ইচ্ছে করছিল ছুটে চলে যাই বাবা ভাইয়ের সাথে। যেতে পারেননি। তারও অনেকদিন পরে একবার ভাই এসেছিল। তখন কলেজে পড়ছে সে। এমনি আসেনি। সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল বাবার মৃত্যু সংবাদ। সেবারেও যেতে পারেননি ইন্দুবালা। শাশুড়ি যে খুব অসুস্থ তখন। তারপর আর একবারের জন্যেও ভাইকে দেখেননি ইন্দুবালা। ভাই শহীদ হয়েছিল একাত্তরের যুদ্ধে। ভাই ছিল মুক্তিযোদ্ধা। দরজা থেকে বিদায় দিয়ে এসেছিলেন মা ঠাম্মাকে। বাবাকে বিদায় দিয়েছিলেন শ্বশুর বাড়ির দরজায়। ভাই এসে দিদিকে দেখে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু সেও জানে কোথায় নিয়ে যাবে তার দিদিকে? আর কিভাবে? ততদিনে যুদ্ধের দামাম বেজে গেছে। একের পর এক গ্রাম জ্বলছে। সবাইকে হারিয়ে ইন্দুবালা এখন একা। তার কোলাপোতার ভিটে বাড়ির মতো। ইন্দুবালা ভাতের হোটেলের মতো। বাগানের পেছনে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা নারকেল গাছটার মতো। 

এখনও এইসব এতোটুকুও ভাবলে চিকচিক করে ইন্দুবালার চোখ। মনে হয় প্রেশারের ওষুধ খেতে বুঝি ভুলে গেছেন। বেতের ছোট্ট ঝাঁপি খোলেন। ওষুধ খান। ওপরের জানলা দিয়ে সকালের বাগানটাকে এই ছেনু মিত্তির লেনেও স্বপ্নের মতো মনে হয়। রান্নাঘর ভরা খাবার শাশুড়ি দেখাতে পারেননি ঠিকই। কিন্তু তাঁর দূর দৃষ্টি ছিল প্রখর। বুড়ি হাত ধরে নিয়ে এসেছিলেন নতুন বউকে বাড়ির পেছনের বাগানটায়। বলেছিলেন, “চোখ ভরে দেখ বউ। কেমন উপোছাপা হয়ে আছে আমার সংসার। বেধবা মানুষ আমি। শুভকাজের ভাতের হাড়ি চাপানোর নিয়ম নেই আমার। নিজের সংসারে অমঙ্গল করতেও চাইনে। বাগান থেকে নিজের ইচ্ছে মতো যেটা মনে হয় সেটা তুলে আন গে। নিজের বউভাতের রান্নাটা যে আজ তোকেই করতে হবে।” কেমন যেন চমকে ওঠেন ইন্দুবালা। এর আগে কোলাপোতায় রান্না করেননি এমনটা নয়। জোর করে ঠাম্মা রান্না করাতো নিজের কাছে নিয়ে বসে। কখনও সখনও নিজেরও ইচ্ছে করতো। ভাইদের বলতেন “যা তো কলাপাতা কেটে নিয়ে আয়। আজ ফিস্টি হবে।” ভাইয়েরা আরও কয়েকজনকে জুটিয়ে একগাদা শুকনো খেজুরের পাতা টানতে টানতে নিয়ে চলে আসতো। খেজুরের শুকনো পাতার আঁচে ইন্দুবালা ক্ষুদ জাল দিতেন। ছোট ছোট আলু কেটে, নতুন ওঠা পেঁয়াজ কুচো করে, লঙ্কা চিরে লাল করে ভাজতেন। সবাই মিলে উঠোনে বসে যেন অমৃত খাচ্ছেন বলে মনে হতো। কিন্তু তাই বলে শ্বশুর বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই তাকে রান্না করতে হবে? এমনকি নিজের বউভাতের রান্নাটাও? এই যে বাবা বলেছিল ছেলে নাকি মাষ্টার? শিক্ষা-দীক্ষা আছে। দোতলা পাকা বাড়ি। জমিদারের বংশ। রাজ্যের চাকর-ঝি। “আমাদের ইন্দু খাটের ওপর পা তুলে বসে খাবে”। খুব একটা বেশি দিন লাগেনি নিজের শ্বশুর বাড়ির স্বরূপ চিনতে ইন্দুবালার। যে স্বামীকে ‘মাষ্টার’ বলে পরিচয় করানো হয়েছিল মেয়ের বাড়িতে সম্বন্ধ পাতানোর সময়। তিনি মাষ্টার ছিলেন বটে তবে তাস, পাশা, জুয়ার। চিৎপুর পাড়াতেও বেশ যাতায়াত ছিল তাঁর। রথের পরে পরেই আর ঘরে মন টিকতে চাইতো না। মুখে বলতেন পালাকার। কিন্তু আদপেই তার ধারে কাছে কোন কলম কোনদিন দেখেননি ইন্দুবালা। এমনকি এক ছত্র লিখতেও। কাজেই স্বামী মানিকরতন মল্লিক যাই বলতেন তাই যে ইন্দুবালা বিশ্বাস করে যেতেন তেমনটা নয়। কিছুটা বিদ্যে তাঁর পেটেও ছিল। শুধু প্রথম যেদিন তাঁর সামনে কাবুলীওয়ালা মানিকরতনকে পিটলো সেদিনই সব কিছু আরও পরিষ্কার হল। হেন নেশা ছিল না যা স্বামী করতেন না। এপাড়া বেপাড়ায় তাঁর ভালোবাসার মানুষের অভাব ছিল না। শুধু তারা ভালোবাসতো টাকার বিনময়ে। আর টাকা যেত ইন্দুবালার গয়না বিক্রি করে। কাবলিওয়ালা যখন বাড়ির সামনে অমন বড় মানুষটাকে বেধড়ক জুতো খুলে মারছে কেউ এগিয়ে যায়নি। অন্য শরিকরা মুখ চাপা দিয়ে হাসাহাসি করছিল। শাশুড়ি গিয়েছিলেন গঙ্গা স্নানে। ইন্দুবালা কি করবেন বুঝতে না পেরে মাথায় ঘোমটা টেনে সটান রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। কি মনে হয়েছিল কাবলীওয়ালাটার কে জানে। রতনলালকে ফেলে রেখে দু দিনের নোটিস দিয়ে চলে গিয়েছিল সে। যাবার আগে বলে গিয়েছিল “এমন ছ্যাঁচড়া আদমির সাথে আছিস কি করে মা তুই”? সেদিনই মানিকরতনের অন্য নামটাও জেনে যান ইন্দুবালা। সবাই তাকে অলক্ষ্যে ছ্যাঁচড়া বলে ডাকে।  দৈব্যের কি পরিহাস বিয়ের পরে প্রথম দিন শ্বশুর বাড়ির ছোট্ট বাগানে শাশুড়ি যখন ইন্দুবালাকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে চলে গেলেন তখন ইন্দুবালা দেখেছিলেন মাচার ওপরে পুঁইশাকের নতুন পাতা ওঠা ডগা। মাথা উঁচু করে যেন আকাশ দেখতে চায় তারা। ঝুড়ি ভরে পুইশাঁক তুলে নিয়ে এসেছিলেন মনের আনন্দে। কারণ তিনি জানতেন বাবা মেয়েকে দিয়ে যাওয়ার সময় মিষ্টি, কাপড় আরও অনেক কিছুর সাথে দিয়ে গেছেন দুটো বড় ইলিশ। ইলিশের মাথা আর পুইশাক দিয়ে জবরদস্ত ছ্যাঁচড়া রান্না করেছিলেন সেদিন ইন্দুবালা। অতোবড় ডাকাতের চেহারার স্বামী আধ কড়াই ছ্যাঁচড়া একা নিজেই সাবাড় করেছিলেন। প্রথম রাতে তাই সোহাগ উঠেছিল তার দিক থেকে মাত্রা ছাড়া। ইন্দুবালা এতো সবের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। যখন ঘাড়ের ওপর ওই দশাসই চেহারা চেপে বসে একটু একটু করে কৌমার্য শুষে নিচ্ছিল তখন একবারের জন্যেও মনিরুলকে মনে পড়েনি তাঁর। ব্যাথায় চোখ বন্ধ করলে উঠোনের জোনাকি গুলোকে দেখতে পেয়েছিলেন স্পষ্ট। পুকুর পাড়ের কাঁচা মিঠের আম তার ডালপালা নেড়ে ফিসফিস করে বলেছিল “নিয়তি... ইন্দুবালা...নিয়তি...”। 

সামনের ভটচাজ বাড়ি থেকে গিন্নি তাঁর নাতনি রাকাকে পাঠিয়েছে। সে নাকি এবার সায়েন্স না কিসব নিয়ে পড়ছে। কলেজে ভর্তি হয়েছে। একটা সুন্দর দেখতে ট্যাব তার হাতে। ইন্দুবালা আঁচলে চশমা মোছেন। এগিয়ে আসেন রাকার দিকে। “এক্কেবারে মায়ের মুখ বসানো”। থুতনি ধরে চুমু খান। “ভালোই হয়েছে। ভাগ্যিস শান্টুর মতো হোসনি। যা দস্যু ছিল ছেলেটা। মেয়েরা মাখের মুখ পেলে জীবনে শান্তি পায়। জানিস কি সেটা?” রাকা মাথা নাড়ে। এইসব কিছুই সে জানে না। জামশেদপুরে থাকতো। বাবা কলকাতার কলেজে ভর্তি করে দিয়ে বললো “এখানেই পড়াশুনো করো। পড়াও হবে আর দাদু-ঠাম্মাকে দেখাও”। হাসেন ইন্দুবালা। “তা ভালো। তোরা ছাড়া আর ওদের কেই বা আছে বল? তা সায়েন্স নিয়ে পড়ছিস। অতোবড় কলেজ। আমি তোকে কি পড়াবো? বল্টু মন্টুকেই আমি পড়াতে পারিনি কোনদিন। সব লোক রাখতে হয়েছিল। ইরা তো দাদাদের কাছেই পড়েছে। আমি কি শেখেবো বলতো তোকে?” আমতা আমতা করে বলেন ইন্দুবালা। এমনিতেই গাটা ম্যাজম্যাজ করছিল বলে ঘুম থেকে উঠতে দেরী হয়ে গেছে। আচারের বয়াম গুলো জানলার রোদে রাখেন। মাথার ওপর কাপড়ের সাদা ঢাকা গুলোকে পাল্টান। ধনঞ্জয়কে উনুন ধরাতে বলেন। রাকা পেছন পেছন ঘুরঘুর করে। ভালো লাগে ইন্দুবালার। নিজের নাতনি গুলোর থেকেও কত ছোটো। বাড়িতে এমন একটা কেউ না থাকলে চলে? কেমন যেন ছেলে গুলোর কথা মনে পড়ে যায়। মেয়েটার কথাও। নাতি-নাতনি-নাতবউ ভরা সংসার তাঁর। কি এমন ক্ষতি হতো এই বাড়িটায় সবাই মিলে একসাথে থাকলে? ঠিক আছে। না থেকেছে ভালো হয়েছে বাবা। তারপর সেই তো কাটাকাটি, লাঠালাঠি। কম ঝক্কি পোহাতে হয়েছে এই বাড়ির ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে। ভাগ্যিস উনি বেঁচে থাকতে থাকতে ব্যাপারটা সেরে গিয়েছিলেন না হলে তিন ছেলে মেয়ে নিয়ে গঙ্গায় গিয়ে ডুব দিতে হতো। ভালোবাসতেন কি বাবু মাষ্টার মানিকরতন মল্লিক ইন্দুবালাকে? জিজ্ঞেস করেননি কোনদিন ইন্দুবালা। স্বামীর সাথে কথা হত কতটুকু? শুধু শেষ কয়েকদিন বিছানার সাথে যখন মিশে গিয়েছিলেন নিজের মায়ের মতোই, পেটটা ফুলে উঠেছিল বেঢপ। ডাক্তার বলেছিল জল জমেছিল পেটে। অথচ মধ্যরাতে যখন জল খেতে চেয়েছিলেন, ইন্দুবালা জল গড়িয়ে দিতে এসে দেখেছিলেন সব শেষ। বাচ্চা গুলোর তখন বোঝারও বয়েস হয়নি কী ক্ষতি হল তাদের জীবনে। নাকি এই নরক থেকে চিরকালের মুক্তিলাভ।

ইন্দুবালা রোয়াকে নেমে রান্নার বাসন গুলোকে ভালো করে জল ঝরাতে দেন। রাকা অবাক হয়ে জানতে চায় “এই এতো বাসন ইউজ হয় তোমার হোটেলে দিদা?” ইন্দুবালা হাসেন। কি আর উত্তর দেবেন ওই টুকু মেয়েকে? দোতলার ঘরে বড় কাঠের সিন্ধুকটা দেখালে তো অক্কা পাবে। সব নিজের টাকায় বানানো। হাজার লোককে এখনও এক বেলায় খাওয়াতে পারেন ইন্দুবালা। রান্না ঘরে ঢুকে উনুনের আঁচ দেখেন। রাকা যাই দেখছে তাতেই অবাক হয়ে যাচ্ছে “ ওহ মাই গস। কয়লার উনুন? গ্যাস থাকতে এখনও তুমি এইভাবে রান্না করো দিদা? আমার কলেজে বললে সবাই এক্ষুনি ছুটে আসবে দেখতে। ইভন আমাদের ম্যামও।” ঘুরে তাকান ইন্দুবালা। “এই তো বললি কিসব সায়েন্স নিয়ে পড়ছিস তাতে উনুন দিয়ে কী হবে? আর তোর কলেজের লোকজনই বা দেখতে আসবে কেন?” রাকা হেসে ফেলে। “তুমিও দিদা। পড়ছি তো হোম সায়েন্স নিয়ে। কুকিং আমার স্পেশাল পেপার। এক্কেবারে হান্ড্রেড মার্ক্স। উইথ প্র্যাকটিকাল। তাই না তোমার কাছে এসেছি।” ইন্দুবালা এতক্ষণে যেন ব্যাপারটা ঠাহর করতে পারেন। “রান্না নিয়ে পড়ছিস নাকি তুই? সেটা আগে বলবি তো বোকা মেয়ে। সায়েন্স টায়েন্স শুনে আমার তো হাত-পা ঠান্ডা”। ভটচাজ গিন্নি চালাক চতুর। ঠিক বুঝেই নাতনিকে পাঠিয়েছে ইন্দুবালার কাছে। “বই-পত্তরে, আর তোদের ওই কম্পিউটারের থেকে বেশী জানে বুড়ি। শিখে নিতে পারলে আর তোকে ঠেকায় কে।” ইন্দুবালা ভাতের হোটেলের প্রথম আঁচ গনগনে হয়ে যায়। আগুনের পাশে পেতলের থালায় সিধে রাখেন। আতপ চাল। একটা গোটা পান। কাঁঠালি কলা। একটা আস্ত সুপারি। কোনদিন মিষ্টি জোটে তো ভালো। না হলে বাতাসা। এতে অগ্নিদেব খুশি হয়। গেরস্থ বাড়িতে অনুষ্ঠানে হাড়ি চাপানোর আগে রান্নার ঠাকুররা এইসব চেয়ে চিনতে নিত। এখনো হয়তো নেয়। কিন্তু ইন্দুবালা এই আচার মেনে চলেন প্রতিদিন। মানুষের মুখের অন্ন বিক্রি করেন। যা তা কথা নয়। সামর্থ যদি থাকতো সবাইকে বিনা পয়সায় খাওয়াতেন ইন্দুবালা। তেমন খদ্দের যে নেই তা নয়। সেই লিস্টের খাতা না হয় অন্য কোনদিন খোলা যাবে। ইন্দুবালার ঠাম্মা উনুনের প্রথম আঁচে কয়লার ওপর ছড়িয়ে দিতেন অল্প করে চিনি। এতে আঁচটাও ভালো হয় আর অগ্নিদেবকে তুষ্টও করা হয়। ইন্দুবালা উনুনের পাশে ধূপ জ্বেলে দেন। উনুনের ওপর মুঠো করে ছড়িয়ে দেন চিনি। আঁচের ওপর ধক করে জ্বলে ওঠে আগুন। হাতজোড় করে প্রনাম করেন। “সবার পাতে অন্ন জুগিও ঠাকুর”। রাকা ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে দেখে। এইসব তাদের কলেজে শেখায়নি কোনদিন। তাদের তো সব মডিউলার কিচেন। আধুনিক ইকুইপমেন্ট। জল গরম করতে হলে জাস্ট টাইমার দিয়ে দাও। ইন্দুবালা বড় হাড়িতে জল বসান। দুমুখো উনুনে আর একটাতে বসান বড় লোহার কড়াই। গরম হয়ে গেলে মুগের ডাল ভাজতে থাকেন। কেমন করে ডাল আন্দাজ করতে হয়। কেমন করে জল। মাথা গুনে ভাতে চালের পরিমাপ। ইন্দুবালা শেখান রাকাকে। মনে মনে ভাবেন এইভাবে একদিন তাঁর ঠাম্মা তো তাঁকে রান্না শেখাতো। শুধু কত রকমের ফোড়ন হতো সেগুলো সব মনে রেখে দিতেন। এখনকার রাকা সেগুলো তার ট্যাবে লিখে রাখে চটপট। ছবি তোলে। ভিডিও করে। বাইরে গাড়ি এসে থামে। কেউ মা বলে ডাকে। ইন্দুবালা ঘুরে তাকান। বড় ছেলে, মেজো ছেলে তাদের বউদের নিয়ে এসেছে। যাক বাবার মারা যাবার দিনটা তাদের তাহলে মনে আছে। যদিও মনে থাকার কথা নয়। ইন্দুবালা মনে করিয়ে রাখতেন সেই ছোট্ট বেলা থেকে। রক্তকে অস্বীকার করা মানে নিজেকে অস্বীকার করা। ছেলেরা এসেছে অবশ্য তারিখটাকে লক্ষ্য করেই। বাবাকে তো তাদের মনে নেই। কিন্তু বিশেষ দিনটা মনে আছে। এই দিনে মা যে ছ্যাঁচড়াটা রান্না করে তা সারা বছর যেন মুখে লেগে থাকে। (ক্রমশ)

 
ঋণ- ঠাম্মা, মনি, দিদা, রাঙা, বড়মা আর মা। এছাড়াও বাংলার সেইসব অসংখ্য মানুষদের যাঁদের হাতে এখনও প্রতিপালিত হয় আমাদের খাওয়া দাওয়া। জিভে জল পড়ার ইতিহাস। 

ছবি সৌজন্যঃ-  গুগুল ইমেজ।